ড্রয়িংরুমে পা দিয়েই আমি আন্দাজ করেছিলাম যে আজ গোলাম রাব্বানীর বাসায় কোনো এক রহস্যময় কারণে যুদ্ধবিরতি চলছে। এটা মনে করার কারণ হলো, গতরাত থেকেই তাদের বাসা থেকে গুলাম আলীর ‘হাংগামা হে কিঁউ বারপা, থোড়িসি জো পি-লিহে’ বেজেই যাচ্ছে।
বিরস চামেলী গান শুনবে, তা ঘোর মাতালও বিশ্বাস করবে না। তার মেজাজ মোটামুটি সপ্তমেই চড়ে থাকে। দেখতে সুশ্রী হওয়ার কারণেই হয়তোবা প্রতিবেশীদের বাসায় ঠিক যাওয়া-আসার লৌকিকতা কখনো দেখান না তিনি। প্রতিবেশী ভাবিদের বেশি পাত্তা দিলে নিজের প্রেস্টিজ থাকে কিনা এই ভয় তার।
তবে গোলাম রাব্বানী মানুষটি মোটামুটি শান্ত প্রকৃতির—মানে এতটাই শান্ত যে, পাশের বাড়ির ড্রিল মেশিনও তার চেয়ে বেশি আওয়াজ করে। পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু নিজের সংসারের ‘সিভিল’ অবস্থা যে কবে ‘মিলিটারি রুলে’ চলে গেছে, তা তিনি নিজেই বুঝতে পারেন নি।
তার স্ত্রী চামেলী বেগম—নামে যেমন ফুল, স্বভাবে তেমন কাঁটা। তবে এই কাঁটা আবার এমন কাঁটা, যেটা নিজেই সন্দেহ করে গাছটা অন্য কারও বাগানে পানি দিচ্ছে কিনা।
চামেলীর জীবনের মূল নীতি একটাই—“স্বামী মানেই সন্দেহভাজন।”
রাব্বানী সাহেব অফিসে গেলে চামেলী মনে মনে ভাবে, “এখনই বুঝি কোনো লাবণী, সাবিনা, নাসরিন—যে কেউ এসে বলবে, ‘স্যার, একটু ড্রইংটা দেখাবেন ?’ আর সেই ড্রইংয়ের ফাঁকেই প্রেমের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি হয়ে যাবে!”
ফলাফল ?
অফিস থেকে ফিরে রাব্বানীর অবস্থা হয় ঠিকাদারের মতো—
কাজের লিস্ট লম্বা :
বাসন মাজা
ঘর ঝাড়া
বাজার করা
আর মাঝে মাঝে ‘বউ মনিটরিং সেবা’য় মত্ত থাকতে হয়।
গোলাম রাব্বানীর কাছ থেকেই শোনা তার বউয়ের সন্দেহবাতিকের নমুনা আমি দিতে পারি।
সে হয়তো হঠাৎ করে মোবাইলে নতুন পাসওয়ার্ড দিয়েছে।
চামেলি: “আগে তো কিছু লুকানোর ছিল না, এখন কী এমন গুপ্তধন জমা হয়েছে ?”
অফিসে যাওয়ার আগে নতুন শার্ট, পারফিউম লাগাচ্ছে।
চামেলি: “অফিসে বস না, ‘কেউ বিশেষ’ আছে নাকি ?”
দেরি করে বাসায় ফেরা
গোলাম রাব্বানী বলে “ট্রাফিক ছিল।”
চামেলি: “ট্রাফিক না, ‘ট্রাফিকের আড়ালে’ কিছু ছিল ?”
বারবার মেসেজ চেক করা
বেচারা রাব্বানী বারবার ফোন দেখছে আর হালকা হাসছে।
চামেলি: “আমার মেসেজে তো এমন হাসো না, কার সাথে চ্যাট করা হচ্ছে শুনি ?”
স্বামী হঠাৎ জিমে ভর্তি হয়েছে।
চামেলি: “স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য, নাকি কাউকে ইমপ্রেস করার জন্য ?”
নতুন নাম্বার থেকে কল মানে অজানা নাম্বার থেকে ফোন এলে স্বামী বাইরে গিয়ে কথা বলে।
চামেলি: “এত গোপন কথা! আমি শুনলে সমস্যা ?”
পুরোনো বন্ধুর অজুহাত দিয়ে স্বামী বলে “বন্ধুর সাথে দেখা করতে যাচ্ছি।”
চামেলি: “বন্ধুটা কি নতুন নাকি পুরোনো—নামটা বলো তো!”
এই সন্দেহগিরির মাঝেই তার নিত্য বসবাস।
একদিন দেখি রাব্বানী বাজার থেকে ফিরছে, হাতে তিনটা ব্যাগ, কাঁধে আলুর বস্তা, আর মুখে এমন এক অভিব্যক্তি যেন সে নিজেই নিজের টেন্ডার বাতিল করে দিয়েছে।
আমি বললাম, “কী রে ভাই, এত কিছু ?”
সে হেসে বলল, “ভাই, সংসারটা আসলে একটা মাল্টিস্টোরি প্রজেক্ট। আমি শুধু লেবার।”
গত বৃহস্পতিবারের ঘটনাটা আপনাদের না শেয়ার করে পারছি না। আমার দরজার সাথেই রাব্বানীর বাসা। একেবারেই সামনা-সামনি। কাজেই জুতা পরার সময়, বাস্কেটে ময়লা ফেলার সময়, ডিসের বিল দিতে গেলে, জুম্মার দিন, পত্রিকার কপি সংগ্রহের সময় এমনকি অফিসে যাওয়ার সময়ও গায়ে ধাক্কা লাগার অবস্থা হয়। ফলে বাঙালি কালচার রক্ষার জন্য হলেও কুশল বিনিময় করতেই হয়।
“কী খবর গোলাম রাব্বানী, কেমন যাচ্ছে দিনকাল ?”
“আর দিনকাল কামাল ভাই! এই ঘানির চোখবাঁধা বলদের জীবন আর ভাল্লাগে না। ঘুরে ঘুরে ঘানির তেল বের করে দিচ্ছি, অথচ একটু ঝিমুনি আসলেই পিঠে শপাং! লাঠির আঘাত! এর চাইতে অরণ্যচারী হতে পারলেও ভালো লাগত। সারা দিন-রাত গাছ-গাছালির সাথে কথা বলতাম!”
“ভাবির সিজোফ্রেনিয়া কাটে নি এখনো ?”
“ধুর, সে সিজোফ্রেনিক হবে কেন, একটা আস্ত সার্পেন্টাইন! সাপের মতোই হিংস্র আর যখন তখন হিস হিস করে বেড়ায়। আমার কপালটা একেবারেই ফাটা ভাই।”
এবার সত্যিই তার ফাটা কপালের দিকে নজর যায় আমার। এতক্ষণে মাথার চাদর সরে যাওয়ায় কপালের ব্যান্ডেজ দেখে আমি আঁতকে উঠি।
“একি! কীভাবে কী হলো তোমার।”
একথায় কাঁদো গলায় গোলাম রাব্বানী গত রাতের প্রলয়ের বর্ণনা দেয়।
আসুন, তার জবানিতেই শোনা যাক।
গতকাল ছিল আমার বাসায় এক ঐতিহাসিক সন্ধ্যা। অফিস থেকে ফিরে বার দশেক কলিংবেল টিপেও কাজ হয় না। বেলে শব্দ হয়, কিন্তু চামেলি দরজা খোলে না। আমি বেদম ভয় পেয়ে যাই। আমার চামেলিফুলের কোনো সমস্যা হয় নি তো!
আমি মানিব্যাগের চিপায় রাখা ডুপ্লিকেট চাবি ঘুরিয়ে বাসায় ঢুকি।
ওমা! একী কাণ্ড! চামেলির নিথর দেহ বিছানায় পড়ে আছে। গায়ে হাত দিয়ে দেখি ভীষণ জ্বর।
আমি আবার বউপাগল মানুষ! (আপনাকে গোপন কথাটা বলি, আসলে ভয় থেকেই তার প্রতি আমার ভক্তি জন্মেছে কিন্তু! এটাকে ভয়ক্তি বলা যায়।)
“চামেলি,ও চামেলি! কথা বলছ না কেন ?”
অনেকক্ষণ পরে চামেলি চোখ মেলে তাকিয়ে আমাকে ফিসফিস করে বলল, “আমি বুঝি আর বাঁচব না গোলাম!”
“কী পাগলের মতো কথা বলছ এসব! মানুষের কি অসুখ হয় না ? আবার সেরেও তো যায়।”
“আমার সারবে না, গোলাম। এটা মরণব্যাধি!”
“এই দ্যাখো, আমি তোমার কাছেই আছি। তোমার কিচ্ছু হবে না”, বলে চোখ টিপে টিপে পানি বের করি। হাত-পা টিপে দিই।
রোগী এবার কাত ফিরে শোয়। মানে কোমর, নিতম্ব এগুলোও মালিশ করতে হবে। আমি প্রাণভরে স্ত্রী সেবায় মত্ত হই। অসুস্থ স্ত্রীর সেবা করেই নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে হয়।
“গোলাম!”
রোগী এবার পিঠ চুলকিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
শুধু গোলাম কেন, গোলামের বেটা গোলাম বলো! আমরা গোলামের বংশ। আমার বাবা গোলাম কাব্বানিও এই গোলামি করেই পুণ্য লাভ করেছিল।
“জানো সোনা, আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি সমুদ্রের মাঝে জাহাজ ডুবে মারা যাচ্ছি, আর তুমি সৈকতে এক সুন্দর-ফরসা মেয়ের হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছ। বিশ্বাস করো, আমার যে কী ভালো লাগছিল! মনে হচ্ছিল, আমি মারা গেলে এরকম একটা মেয়ের হাতে রাব্বানীকে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্তে দোজখে যেতে পারতাম।”
এক নাগাড়ে কথাগুলো বলেই জোরে জোরে দম টানে চামেলি। আর পিটপিট করে আমার দিকে তাকায়।
আমার চোখের সামনে এবার লাবনীর ছবি ভেসে ওঠে।
লাবনী আমার সহকর্মী। পাশাপাশি ডেস্কে কাজ করি বলে প্রায়ই একসাথে লাঞ্চ করি আমরা। এই লাজুক মেয়েটি খুব কেয়ারিং।
আমি মৃত্যু পথযাত্রী স্ত্রীর পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলি এবার।
“না, মানে লাবনী অবশ্য তোমার স্বপ্নের মতোই একটা মেয়ে। কিন্তু, তোমার বিকল্প কি কোথাও পাব বলো!”
“তবুও আমাকে কথা দাও, লাবনীর মাঝেই তুমি আমাকে খুঁজে নিবে। কথা দাও গোলাম।”
স্ত্রীর পরম ভালোবাসায় আমার হৃদয় বিগলিত হয়ে ওঠে। পরে বুঝেছিলাম চামেলী সেদিন হঠাৎ জ্বরের অভিনয় শুরু করেছিল। থার্মোমিটার নেই, কিন্তু নাটক থার্মোমিটারের পারদ ছাড়িয়ে গেছে।
“ওগো রাব্বানী—আমি আর বাঁচব না—কথা দাও, আমায় কথা দাও।” বলে এমনভাবে হাত বাড়াল, যেন এখনই উইল লিখে ফেলবে।
আমি রাব্বানী তখন পুরোপুরি নার্সিং ট্রেনিংয়ে ঢুকে গেছি। গা টিপে, হাত টিপে, পা টিপে এমন অবস্থা করেছি যে, চামেলীর যদি সত্যিই জ্বর থাকত, সেটা লজ্জায় পালিয়ে যেত।
এই ‘টিপাটিপি সেশন’-এর মাঝখানে ঘটে গেল বিপর্যয়। দুর্বল মুহূর্তে আমি হঠাৎ বলে ফেলি—
“আসলে অফিসে গেলে ওই মেয়ে, লাবণী, তাকে একটু ভালো লাগে।” কথা দিলাম চামেলি,কথা দিলাম।”
এই কথাটা বলা মাত্র, ঘরের বাতাস বদলে গেল। জ্বর উধাও।
“তবে রে শুয়োরের বাচ্চা! বহুদিন থেকেই আমি তক্কে তক্কে আছি তোকে ধরব বলে! আজ তুই নিজেই ধরা দিয়েছিস! তাই তো বলি, আমার সাথে কথা বলতেও কেন ইদানীং তোর আর রুচি হয় না!”
গায়ে কৃত্রিম জ্বর নিয়ে আসার জন্য চামেলী বগলের নিচে কাঁচা রসুন দিয়ে রেখেছিল। সে উঠে দাঁড়ালে তা ফট করে মেঝেতে পড়ে যায়।
চামেলীর চোখে আগুন। সে ধীরে ধীরে উঠে বসল—যেমন কোনো সিনেমার ভিলেন চূড়ান্ত দৃশ্যে উঠে দাঁড়ায়।
“কী বললি ?”
এরপর যা হলো, তা ইতিহাসে ‘পিক্সেল যুদ্ধ’ নামে পরিচিত হতে পারে।
চামেলীর হাতে ছিল তার প্রিয় পিক্সেল ফোন। সেই ফোন দিয়ে আমার কপালের মাঝ বরাবর এমন এক আঘাত করল—যেন গুগল নিজে এসে আপডেট দিয়ে গেল।
আমার মাথা ফেটে গেল আর সংসারের শান্তি তো আগেই ফেটে গিয়েছিল।
আজ ঘা প্রায় শুকিয়ে যাওয়ার কয়েকদিন পর আমি রাব্বানীকে দেখলাম—মাথায় ব্যান্ডেজ, মুখে চুপচাপ ভাব।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে ?”
সে চারদিকে তাকিয়ে, যেন সিআইডি তাকে ফলো করছে, তারপর আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—“ভাই, আমি আসলে ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু নিজের জীবনের ক্যালকুলেশনটাই ভুল করে ফেলেছি।”
আমি বললাম, “এখন কেমন আছো ?”
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—“মাথার সেলাই খুলে যাবে কিন্তু বউয়ের সন্দেহের সেলাই আর খুলবে না ভাই।”
তারপর একটু থেমে যোগ করল—“এখন থেকে আমি অফিসে কারও দিকে তাকাই না, এমনকি নিজের ছায়াকেও সন্দেহ করি!”
আমি বাড়ি ফিরে ভাবলাম—মানুষ সেতু বানায়, রাস্তা বানায়, শহর বানায়—কিন্তু দাম্পত্যজীবনের ‘সন্দেহের গর্ত’—তা কোনো ইঞ্জিনিয়ারই ভরাট করতে পারে না!
আর গোলাম রাব্বানী ? সে এখন প্রতিদিন নতুন করে শপথ নেয়—
“আমি শুধু কংক্রিট বুঝি, কনফিডেন্স না।”
মূলত রাব্বানীর এই লাবনী ছিল কাল্পনিক এক চরিত্র। চামেলিকে তার চিন্তার বলয় থেকে বের করে নিয়ে আসার টনিক।
দিন পনেরো পরের ঘটনা। গোলাম রাব্বানীর কপালের কাটা শুকিয়ে এসেছে। সেদিনও ছিল আশ্বিনের এক নরম দিন।
সন্ধ্যা নেমেছে। আকাশে চাঁদের আলো, কিন্তু উঠোনে যেন অন্য এক আলো—চামেলি বেগমের চোখে সন্দেহের শেষ ঝিলিক আর গোলাম রাব্বানীর ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি।
সন্ধ্যার পর রাত নেমে এল ধীরে ধীরে—
চাঁদের আলো উঠোনে ছড়িয়ে পড়ল, কিন্তু সেই আলোতেও যেন লুকিয়ে রইল কিছু অজানা ইশারা।
দিনভর ‘তদন্ত’ শেষে চামেলি বেগম গম্ভীর গলায় বললেন, “আজ সব প্রমাণ জোগাড় করেছি। তুমি কিছু একটা লুকাচ্ছো!”
রাব্বানী চুপচাপ ভেতর ঘরে গিয়ে একটা ছোট্ট প্যাকেট নিয়ে এলেন।
চামেলির ভ্রু আরও কুঁচকে গেল—“এই তো! আমি জানতাম!”
ধীরে ধীরে প্যাকেটটা খুলতেই বের হলো একটা ছোট আয়না আর তার পেছনে লেখা—
“যে লাবনী আমাকে সবচেয়ে বেশি খোঁজে, সন্দেহ করে, আবার সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে—তার জন্য।”
চামেলি বেগম সেই খোলা আয়নায় নিজের মুখ দেখে থমকে গেলেন।
কিছুক্ষণ নীরবতা তারপর হালকা একটা চাপা হাসি—“তা হলে আমি এতদিন নিজের সাথেই প্রতিযোগিতা করছিলাম ?”
রাব্বানী মুচকি হেসে বললেন, “হ্যাঁ, আর সেই প্রতিযোগিতায় তুমি সব সময়ই জিতো।”
হঠাৎ গল্পটা উল্টে গেল—
সন্দেহের ভেতর লুকানো ছিল ভালোবাসারই আরেক রূপ, আর ‘গোয়েন্দা চামেলি’ বুঝে গেলেন—সব রহস্যের শেষ সূত্রটা আসলে তার নিজের হৃদয়েই ছিল।
“যে সন্দেহ ভালোবাসা থেকে জন্ম নেয়,
তার শেষ ঠিকই ভালোবাসায় গিয়েই মেশে;
আর যে হৃদয় খুঁজতে জানে,
সে একদিন নিজেকেই খুঁজে পায় শেষে।”
চামেলি বেগম আয়নাটা হাতে নিয়ে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। তার হঠাৎ মনে হলো—এটা শুধু তার মুখই দেখাচ্ছে না, দেখাচ্ছে তার ভেতরের সেই অদৃশ্য প্রশ্নগুলোও—যেগুলো তিনি কখনো জোরে বলেন নি।
রাব্বানী তখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে, যেন সবকিছু আগেই জানত।
মৃদু স্বরে বলল, “সব রহস্য বাইরে খুঁজো না চামেলি, কিছু রহস্য নিজের ভেতরেই থাকে।”
এক ঝলক বাতাস এল, আয়নার পেছনের কাগজটা একটু নড়ে উঠল—চামেলি খেয়াল করলেন, সেখানে আরেকটা ক্ষুদ্র লাইন—যা আগে চোখে পড়ে নি—
“যে আমাকে খোঁজে, সে একদিন বুঝবে—আমি কখনো দূরে ছিলাম না।”
চামেলির বুকটা হালকা কেঁপে উঠল।
এ কি শুধু রাব্বানীর কথা ? নাকি আরও গভীর কিছু—যা সম্পর্কের ভেতরে, সময়ের ভেতরে, এমনকি নিজের ভেতরেও লুকিয়ে থাকে ?
রাত আরও গভীর হলো।
দূরে কোথাও নাম না-জানা পাখির ডাক, আর কাছেই দুজন মানুষের নীরবতা—যেখানে আর কোনো প্রশ্ন নেই, কিন্তু সব উত্তর যেন ভেসে বেড়াচ্ছে।
“কিছু ভালোবাসা শব্দে ধরা দেয় না,
কিছু রহস্য আলোয় ধরা পড়ে না;
তবুও যারা হৃদয় দিয়ে দেখে—
তারা অন্ধকারেও খুঁজে পায় আলোর ঠিকানা।”
সেদিনের পর থেকে চামেলি বেগম আগের মতো সন্দেহ করেন না—তবে তার চোখে এখন এক নতুন দৃষ্টি—যেখানে প্রতিটি প্রশ্নের আড়ালে তিনি খুঁজে পান একটুকরো মায়া, আর প্রতিটি রহস্যের ভেতরে একটা নীরব, অনন্ত ভালোবাসা।
চাঁদের আলো ফিকে হয়ে এসে যেন মিশে গেল তাদের নীরবতায়—যেখানে আর প্রশ্ন নেই, অথচ উত্তরগুলো নরম করে শ্বাস নেয়।
চামেলি বেগম আয়নাটা বুকে চেপে ধরলেন। গোলাম রাব্বানীর দিকে তাকালেন—কিন্তু সেই দৃষ্টিতে আর অনুসন্ধান নেই, আছে এক অদ্ভুত স্বীকৃতি। হয়তো সব রহস্য ভেদ করতে হয় না—কিছু রহস্যকে শুধু অনুভব করতে হয়।
রবীন্দ্রনাথের কথায়—
“খড়াব রং হড়ঃ ধ সবৎব রসঢ়ঁষংব; রঃ সঁংঃ পড়হঃধরহ ঃৎঁঃয.”
সেই রাতে তারা দুজনেই বুঝলেন—
সন্দেহেরও এক ভাষা আছে,
আর ভালোবাসারও এক নীরব ছায়া—
যেখানে কেউ কাউকে হারায় না,
শুধু নতুন করে খুঁজে পায়।
Leave a Reply
Your identity will not be published.