যাঁর চলচ্চিত্রে মূর্ত হয়ে ওঠে অস্তিত্বের সংগ্রাম

যাঁর চলচ্চিত্রে মূর্ত হয়ে ওঠে অস্তিত্বের সংগ্রাম

সমকালীন বাংলা চলচ্চিত্রের বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষ—যিনি সাহস, নতুনত্বের প্রতি টান আর ডকুমেন্টশনের প্রতি ঝোঁক সব দিক থেকেই মৃণালের উত্তরসূরি। পাশাপাশি নদীর প্রতি দুর্বলতার দরুণ তাঁকে রাজেন তরফদারের উত্তরসূরিও বলা যায়।

১৯৫০ সালে গৌতম ঘোষের জন্ম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। চলচ্চিত্রে আসার আগে নাটক, নাট্য সমালোচনা ও ফটোসাংবাদিকতার কাজ করেছেন। প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নিয়ে গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্রকার হওয়া। প্রথম ছবি করেন কলকাতার লোডশেডিংয়ের ওপর। যদিও সেটি শেষ করতে পরেন নি। তারপর সরকারি প্রচারধর্মী চলচ্চিত্র ‘নিউ আর্থ’-এর পরে ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষের ওপর একটা প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন—‘হ্যাংরি অটাম’ (১৯৭৬)।

গৌতম ঘোষের প্রথম কাহিনিচিত্র ‘মা-ভূমি’ (১৯৮০)—তেলেগু ভাষায় নির্মিত। বাংলায় প্রথম কাহিনিচিত্র নির্মাণ করেন ১৯৮১ সালে। চলচ্চিত্রটির নাম ‘দখল’। ৭২ মিনিটের স্বল্পদৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্র। কেন্দ্রীয় চরিত্র আবার পুরুষ নয়, এক যাযাবর রমণী, আন্দি। যাকে ঘিরেই ন্যায়-অন্যায় দখলের দ্বন্দ্ব। স্বামীহীন আন্দির সঙ্গে জমিদারের অন্যায়ভাবে জমি দখলের ঘটনায় ভারতীয় সমাজের বাস্তবিক দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে। গৌতম একই সঙ্গে ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন জাতি উপজাতি গোষ্ঠীর মধ্যকার দ্বন্দ্বকে কায়েমি স্বার্থ কীভাবে ব্যবহার করছে তাও তুলে ধরেছেন।

গৌতম ঘোষের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাহিনিচিত্রসমূহ হচ্ছে—পাড় (১৯৮৫), অন্তর্জলী যাত্রা (১৯৮৯), পদ্মানদীর মাঝি (১৯৯২), দেখা (২০০১) প্রভৃতি।

‘পাড়’ গৌতমের হিন্দি চলচ্চিত্র। সমরেশ বসুর গল্পের চলচ্চিত্ররূপ। ভারতের মধ্য প্রদেশের এক গ্রাম থেকে অন্ত্যজশ্রেণীর এক দম্পতি কোলকাতায় আসে। অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে তারা এক সময় গঙ্গা নদীতে শূকর পারাপারের কাজ নেয়।

‘অন্তর্জলী যাত্রা’—দুর্বোধ্য জটিল হিসেবে পরিচিত কমলকুমার মজুমদারের উপন্যাসকে গৌতম নির্মাণশৈলীর সঠিক মাত্রায়, প্রচণ্ড ক্ষমতায় চিত্রায়িত করেছেন। এ ছবির প্রধান চরিত্র তিনজন—একজন বৃদ্ধ, একটি বালিকা এবং এক চণ্ডাল। এদের নিয়েই ছবির গল্প। যদিও ছবিতে প্রথাগত অর্থে গল্প নেই। এখানে মানুষের চিরন্তন অনুভূতিগুলো যেমন—প্রেম ও ভালোবাসা, হিংসা, মানুষের বেঁচে থাকার আর্তি ইত্যাদি নিয়ে গৌতম কাজ করেছেন।

গৌতমের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রয়াস। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাসের এই চলচ্চিত্ররূপে নদীমাতৃক বাংলাদেশের দর্শক এই প্রথমবারের মতো নদীর বিচিত্র রূপ প্রবলভাবে অনুভব করতে সক্ষম হলো। পদ্মার ভাঙা-গড়ার সঙ্গে মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, সংগ্রাম—সবকিছুর একটি অসম্ভব সুন্দর তুলনা রয়েছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে, গৌতম তা সেলুলয়েডের ফিতায় মূর্ত করে তুলেছেন।... এই ছবির গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে আছে বর্ষাকাল। বলা যায়, ইতিপূর্বে আর কোনো বাংলা ছবিতে বর্ষার এমন প্রবল উপস্থিতি দেখা যায় নি। বৃষ্টি পতনের বিচিত্রতা, বর্ষা প্লাবিত নদীতে জাল ফেলে জেলেদের মাছ ধরা, আকাশে নিবিড় কালো মেঘ, বাতাসের গর্জন, বর্ষণ মুখর রুদ্র প্রকৃতিকে সন্তুষ্ট করার জন্যে পূজা অর্চনা, জলবন্দি গ্রাম—এইসব শট বা দৃশ্য চমৎকারভাবে ক্যামেরা বন্দি হয়েছে।

‘পতঙ্’ গৌতমের হিন্দি চলচ্চিত্র।... পতঙ্ মানে ঘুড়ি। ঘুড়িকে এখানে প্রতীকী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। ছবিতে অপরাধ জগতের বিভিন্ন স্তর ছুঁয়ে গৌতম চলচ্চিত্রের ভাষায় এটাই বলতে চেয়েছেন যে, যারা খুন করে তাদের চেয়ে বড় অপরাধী যারা খুন করায়।

‘দেখা’ (২০০১)-তে গৌতম শিক্ষিত বাঙালির আলো-আঁধারি জীবনকে তুলে ধরেছেন। এ ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র—শশিভূষণ। কবি। প্রৌঢ় এই মানুষটি সতেরো বছর আগে গ্লুকোমায় দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। মধ্য কলকাতার বিশাল জীর্ণ পৈতৃক বাড়িতে থাকেন। সেই দিনযাপনে থাকে তাঁর স্মৃতির চিত্রমালা এবং বর্তমানের শব্দ-গন্ধ-স্পর্শ। শশিভূষণের এই জীবনের সঙ্গে মিশে যায় তার মাস্টার মশাইয়ের মেয়ে সরমা ও তার দশ বছরের ছেলে সুমনের জীবন, তৎসঙ্গে জন্মান্ধ গায়ক গগন। গগনের না-দেখা জীবনের মুহূর্ত, মধ্যবর্তিনী সরমার জীবনের মুহূর্ত, শশিভূষণের স্মৃতিতে গাঁথা তার স্ত্রী-সন্তান-বন্ধু-বান্ধব আর উত্তাল একটা সময়ের মুহূর্ত—সবকিছুকে ঐকতানে ধরার চেষ্টা করেছেন গৌতম সিনেমাটোগ্রাফি আর সাউন্ডের নিখুঁত কাজের ভেতর দিয়ে।...এই ছবির কাহিনি ও সংলাপ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের। ছবির শেষে সাউন্ডট্রাকে বেজে ওঠে সুনীলের কবিতা—‘একদিন কেউ এসে বলবে/ তোমার বুকের সিন্দুকটা অনেক দিন খোলা হয় নি/ একটু আলো লাগাও...’। হ্যাঁ, ‘দেখা’-র বক্তব্য হচ্ছে, একজন শিল্পীকে যেমন সৃষ্টিশীল হতে হবে, তেমনি মানবিকও হতে হবে।

বর্তমানে গৌতম নির্মাণ করছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাহিনি ও সংলাপ নিয়ে ‘আবার অরণ্যে’। হ্যাঁ, এটি সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ছবির সম্প্রসারিত রূপ। বত্রিশ বছর পরে সেই তিন বন্ধু অসীম, হরি ও সঞ্জয় হঠাৎ করেই প্ল্যান করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হাজির হয় উত্তরবঙ্গের জঙ্গলে (তবে এই দলে নেই শেখর। যেহেতু এই চরিত্রের অভিনেতা রবি ঘোষ বেঁচে নেই), সেখানে তাদের যাপিত জীবনের ঘটনা নিয়েই এই চলচ্চিত্র। নতুন প্রজন্মের গল্প। এ ছবিতে পুরোনো বলতে আছে অরণ্যের দিনরাত্রির পাঁচটি চরিত্র—সৌমিত্র, শুভেন্দু, শমিত, শর্মিলা আর অরণ্য। এদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের দ্বন্দ্ব। কখনো বা মিল। প্রবীণরা কখনো খুঁজে পায় তাদের যৌবন। কখনো ফিরে যায় প্রজন্ম ফারাকের মান্ধাতার আদতে। তা পাত্তাই দেয় না নবীনরা।

অস্তিত্ববাদী চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষের প্রিয় বিষয় হচ্ছে—মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। তাঁর চলচ্চিত্রে অস্তিত্বের লড়াইয়ের বহুমাত্রিকতা দেখা যায়—কখনো ভূস্বামী গোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যাপক কৃষক সাধারণের শ্রেণি সংঘর্ষে (মা-ভূমি), কোথাও নির্জন চরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ে (দখল) বা বেঁচে থাকার প্রয়োজনে একপাল শুয়োরকে নদী পারাপার করানোর কাজে রত (পাড়) অথবা মুমুর্ষু যে বৃদ্ধ অন্তর্জলী যাত্রার উদ্দেশ্যে গঙ্গার ধারে হাজির হয়েছে—সেই বৃদ্ধও আবার নতুন করে বাঁচতে চায়, পৃথিবীর বুকে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চায় (অন্তর্জলী যাত্রা) কিংবা নদীর বুকে জেলেদের জীবন সংগ্রাম, বিরূপ প্রকৃতি ও প্রতিক্রিয়াশীল মানুষের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে নিজেদের অস্তিত্ব বহু কষ্টে টিকিয়ে রাখা (পদ্মা নদীর মাঝি) লক্ষণীয়।

গৌতমের আরেক প্রিয় বিষয় ‘নদী’। তাঁর বেশিরভাগ চলচ্চিত্র (যেমন—‘পাড়’, ‘অন্তর্জলী যাত্রা’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’) নদী একটা মোটিফ রূপে এসেছে। এটা খুব সচেতনভাবে এসেছে তা নয়, গৌতম ঘোষের ভাষায়, “...নদী সম্পর্কে দুটি জিনিস আমি শৈশব থেকে অনুভব করেছি। এক হচ্ছে নদীর কাছাকাছি গেলে আমার স্নায়ুর মধ্যে কিছু একটা কাজ করে। নদীর এপার-ওপার দেখে মনে হয় যে, মানুষের অনেক কিছুকে মাপা যায়।...আর নদীর যে প্রবাহ সেটা শৈশব থেকে আমাকে আলোড়িত করেছিল। পরবর্তীকালে আমার মনে হয়েছিল নদী হচ্ছে সমস্ত সভ্যতার প্রতীক। যেহেতু আমাদের দেশ নদীমাতৃক দেশ। একে কেন্দ্র করে সব জীবন। এই রকম অবচেতন মনে নদীটা বারবার আমার ছবিতে ফিরে এসেছে।” এবং ‘ক্ষুধা’—এই বিষয়টিও গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্রে ঘুরেফিরে এসেছে। প্রামাণ্য চলচ্চিত্র (হ্যাংরি অটাম) থেকে শুরু করে কাহিনিচিত্রে (যেমন—‘দখল’, ‘পাড়’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’) বারবার ক্ষুধার বিষয়টি আমরা লক্ষ করি। এছাড়া ভারতীয় সমাজ নারীর অবস্থানটিও (‘দখল’, ‘অন্তর্জলী যাত্রা’) বিশ্লেষিত হয়েছে গৌতমের চলচ্চিত্রে।

‘কালবেলা’ (২০০৯) গৌতমের আরেকটি চলচ্চিত্র। সমরেশ মজুমদারের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নকশাল আন্দোলনের পটভূমিতে নির্মিত। ‘মনের মানুষ’ (২০১০), গৌতমের এ ছবিটি নির্মিত হয়েছে মরমী সংগীত সাধক লালন শাহ’র জীবনকে ঘিরে। ছবিতে প্রসেনজিৎ চরিত্রানুগ অভিনয় করেছেন।

অন্যদিকে ‘শঙ্খচিল’ (২০১৫)-এর কাহিনি গড়ে উঠেছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং পরবর্তী সময়ের সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প নিয়ে। প্রধান দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন ভারতে পশ্চিমবঙ্গের প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং বাংলাদেশের কুসুম শিকদার।

প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও গৌতম ঘোষ রেখেছেন উজ্জ্বল স্বাক্ষর। আগেই বলা হয়েছে, প্রামাণ্য চলচ্চিত্রকার হিসেবে গৌতমের কেরিয়ার শুরু। ছবিটি ছিল লোডশেডিংয়ের ওপর। পরে তিনি নির্মাণ করেন ‘হ্যাংরি অটাম’, ‘বেন্স অব বন্ডেজ’, ‘ল্যান্ড অব স্যান্ড ডিউস’, ‘মিটিং এ মাইলস্টোন’, ‘থিয়েটারের সন্ধানে’ এবং ‘মোহর’। বলা যায়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে গৌতম ঘোষের ভূমিকা অনেকটা স্থপতির মতো। চলচ্চিত্র সম্পর্কে গভীর অভিনিবেশ এবং প্রখর চলচ্চিত্রবোধের জন্যে তাঁর প্রতিটি চলচ্চিত্রই তাৎপর্যপূর্ণ।

 

আগামী ২৪ জুলাই গৌতম ঘোষ ৭৭-এ  পদার্পণ করবেন। তাঁর চলচ্চিত্রের জার্নি আরও নান্দনিক হোক।

 

 

Leave a Reply

Your identity will not be published.