[আনিসুজ্জামান ছিলেন ‘অন্যদিন’-এর আপনজন। আমাদের অভিভাবক।
‘অন্যদিন’-এর হয়ে তিনি নানা সময়ে দেশের প্রথিতযশা ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, কবীর চৌধুরী, ফজলে হাসান আবেদ, মুর্তজা বশীর প্রমুখ।
২০১৭ সালে আনিসুজ্জামান প্রথিতযশা রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। এটি প্রকাশিত হয়েছিল সেই বছরের ‘অন্যদিন’ ঈদসংখ্যায়। সেই সাক্ষাৎকারটি এখানে তুলে ধরা হলো।]
র-য়ে রবীন্দ্রসংগীত। র-য়ে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। দুটি অবিচ্ছেদ্য। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহধন্য শিষ্যা বন্যা রবীন্দ্রসংগীত-শিল্পীদের অগ্রগণ্য। দেশে-বিদেশে যেখানে বাঙালি আছে, সেখানেই তাঁর আমন্ত্রণ। শ্রোতাদের ভালোবাসা, গুরুজনদের প্রশংসা, প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান—সবই তিনি পেয়েছেন। নিজেও গড়ে তুলেছেন সংগীতশিক্ষার প্রতিষ্ঠান। চৈত্রসংক্রান্তির সন্ধ্যা থেকে নববর্ষের প্রভাতকাল পর্যন্ত হাজার শিল্পীকে নিয়ে যেভাবে তিনি বর্ষবরণের আয়োজন করেন, তাও সকলের অনুমোদন লাভ করেছে। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে আরও একটু ভালো করে জানার জন্য, তাঁর ব্যক্তিগত পটভূমি, সংগীতশিক্ষার পর্ব, শিল্পীজীবন এবং শিক্ষকতার কাল—সবকিছু তুলে ধরার লক্ষ্যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অন্যদিন-এর পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন বলে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অন্যদিন-এর সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম, নির্বাহী সম্পাদক আবদুল্লাহ্ নাসের এবং সহকারী সম্পাদক মোমিন রহমান।
মাজহারুল ইসলাম : অন্যদিন-এর ঈদসংখ্যার একটি প্রধান আকর্ষণ থাকে—সর্বজনশ্রদ্ধেয় গুণীজন অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের নেওয়া দেশের গুণী মানুষদের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। বিগত বছরগুলোতে তাঁর নেওয়া বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে—কবি শামসুর রাহমান, লেখক-অনুবাদক কবীর চৌধুরী, শিল্পী আমিরুল ইসলাম, শিল্পী মুর্তজা বশীর এবং সমাজসেবী ফজলে হাসান আবেদের। সেই ধারাবাহিকতায় এ বছর একটি বিরল ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। আমাদের প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, তাঁর সাক্ষাৎকার নেবেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। আমরা সাক্ষাৎকারটি শুরু করার জন্য স্যারকে অনুরোধ করছি।
আনিসুজ্জামান : আমি আজ বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার সাক্ষাৎকার নিতে যাচ্ছি। বন্যার পরিচয় নতুন করে দেওয়ার কিছু নেই। এটুকু উল্লেখযোগ্য যে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘বঙ্গভূষণ’ খেতাবে ভূষিত হয়ে বন্যা ফিরেছে। তার জন্য প্রথমে বন্যাকে অভিনন্দন। বন্যার সঙ্গে আমার একটা ব্যক্তিগত অন্তরঙ্গ সম্পর্ক আছে। মামা-ভাগ্নির সম্পর্ক। তার জীবনের অনেক কথা আমি জানি। তবু জানা বিষয়েও আমি প্রশ্ন করব পাঠকদের জানাবার জন্য। আমরা প্রথমেই জানতে চাইব, বন্যার পারিবারিক পরিমণ্ডল কেমন ছিল এবং সংগীতে তার আকর্ষণ কীভাবে জন্মাল ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : পারিবারিক ব্যাপার আপনি আরও ভালো বুঝবেন। মা’র দিকটা তো আপনার খুবই ভালো জানা। আমার মামারা ছয় ভাই ছিলেন। মা ছিলেন তাঁদের একমাত্র বোন। আমার নানা ছিলেন না, নানি সংসারের হাল ধরেছিলেন। সে সময়কার পরিপ্রেক্ষিতে নানি খুব দৃঢ়চেতা এবং দাপুটে মানুষ ছিলেন। আর বাবারা বারো ভাইবোন ছিলেন। তাঁদের পৈতৃক বাড়িটি একেবারে অজপাড়াগাঁ বললে কম বলা হবে, প্রত্যন্ত একটা গ্রামে, যেখানে যেতে দুই দিন সময় লাগত। আমার দাদাবাড়ি ছিল সেই দেউলিতে। এখনকার পটুয়াখালি জেলার মির্জাগঞ্জ থানার একটা গ্রাম। দেউলিপুর গ্রামটার নাম। আমার যেটা মনে আছে সেখানে প্রথম যাওয়ার সময় ঢাকা থেকে গাড়ি করে গেলাম বরিশালে। তারপরে বরিশাল থেকে লঞ্চে চড়ে গেলাম পটুয়াখালি জেলার পটুয়াখালি থেকে আরেকটা নৌকা করে গেলাম মির্জাগঞ্জ। তারপর মির্জাগঞ্জে গিয়ে আমাদের নৌকা লাগানো হলো একটা ঘাটে। কেন লাগানো হলো ? জোয়ার যখন আসবে তখনই পানি খালে ঢুকবে, ওই পানিতে নৌকাটা গ্রামের মুখে যাবে। তো বসে থাকলাম। রাত্রি বারোটা বা একটার সময় জোয়ার আসার পরে নৌকা খালে ঢুকল। একপর্যায়ে দাদাবাড়ির ঘাটে পৌঁছলাম। দেখলাম ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাড়ির লোকজনেরা হারিকেন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তখন নৌকা থেকে নেমে হেঁটে বাড়িতে গেলাম। বলা যায়, এমনই একটা দুর্গম গ্রাম ছিল সেটি। সেখানে আমার বাবা-চাচা-ফুপুরা সব মানুষ হয়েছেন। এই কথাগুলো বলার কারণ এটা যে ওই দুর্গম গ্রামে আমার আট ফুপুর বসবাস ছিল, হারমোনিয়াম ছিল বাড়িতে এবং ফুপুরা মানে পাঁচ ফুপু ভালো গান করতেন। সেই সময়কার সব গান—কাননদেবীর গান, পংকজ মল্লিকের গান, তাঁদের সব গান হারমোনিয়াম বাজিয়ে ফুপুরা গাইতে পারতেন, ওই গ্রামে। দাদা খুবই সংস্কৃতিমনা মানুষ ছিলেন, গ্রামে থেকেও। তাঁর ছেলেমেয়েরা সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছিল। সম্ভবত আমার বাবার মধ্যেও সেই সাংস্কৃতিক বোধ ছিল। অন্যদিকে খোকন মামা, আপনার বন্ধু, খুবই ভালো গান গাইতেন। খোকন মামা গিটার বাজাতেন। অর্থাৎ মার বাড়ি বাবার বাড়ি—দুইদিকেই গানের চর্চা ছিল। যে কারণে বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে আমি গান শুনে আসছি। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের গান। আব্বা রবীন্দ্রনাথের গান গাইতেন। কিন্তু বলা দরকার যে আব্বা তাঁর নিজের সুরে সেই গান গাইতেন। সুরটা কখনো শেখেন নি। যেমন আমি প্রথম যখন শুনলাম ‘বিদায়বেলার মালাখানি তোমায় দেব’, সেটা দেখলাম যে আব্বা গাইছেন সম্পূর্ণ আলাদা সুরে। অবশ্য ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’র সুরটা কাছাকাছি ছিল। তারপরে আরও কয়েকটা গান আব্বার খুব প্রিয় ছিল, যেগুলো সব সময় গাইতেন। সেগুলো শুনে শুনে আমার কান তৈরি হয়েছে। আমার যে খোকন মামা ছিলেন, তিনি কখনো বাইরে প্রফেশনালি গান গান নি। কিন্তু গান ছিল তাঁর রক্তের সাথে মেশা। আব্বার পুরাতন হারমোনিয়ামটা আমাদের বাড়িতে ছিল। খোকন মামা বাড়িতে এলেই সেই হারমোনিয়ামটা নিয়ে আমাদের বলতেন, আসো আসো গান করতে বসে যাও। আমরা তাঁর ডাকে সাড়া দিতাম। সেখানে কোনো গান যে ছোটদের উপযোগী তা কিন্তু না। ‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই’, ‘পুরানো সেই দিনের কথা’, ‘কে বলে যাও যাও’ এসব গান মামা গাইতেন। আমরা শুনে শুনে সেইসব গান কণ্ঠে ধারণ করেছি। অবশ্য কথারও ঠিক নাই, সুরও ওরকমভাবে ঠিক ছিল না। যেমন ‘কে বলে যাও যাও’ এই গানটা আমি অনেক ছোটবেলায় ভাবতাম—কার কথা বলছে ? কে বলে যাও যাও ? পরে যখন অনেক বড় হয়ে গানটা রপ্ত করে হৃদয়ঙ্গম করলাম, তখন মনে হলো যে ওইসময় মামা এইসব গান গাইতেন, আমরা শুনে শুনে শিখতাম, সম্ভবত সেখান থেকে গানের প্রতি একটা প্যাশন তৈরি হয়েছিল। গান শেখা তো অনেক পরে। কিন্তু ছোটবেলা থেকে একটা ভালোলাগার বোধ তৈরি হয়েছিল গানের প্রতি।
আনিসুজ্জামান : বন্যার মামাবাড়িতে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, ওর ছয় মামার প্রত্যেকেরই গলায় কিছু সুর ছিল কিন্তু ওর মায়ের গলায় সুর ছিল না। ছয় ভাইয়ের একমাত্র বোন, তার গলায় সুর ছিল না। এই ছয় মামার মধ্যে যার কথা বন্যা বলল, খোকন মামা, তিনি আমাদের বন্ধু, কলাম লিখে খুব পরিচিতি পেয়েছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি মারা গেছেন। ভালো নাম এ জেড এম আবদুল আলি, গিটার বাজাতেন, বিশেষ করে গাইতেন ঘরোয়াভাবে। পরে অনুষ্ঠানে গেয়েছেন। কিন্তু বন্যার গান শেখার পেছনে তার ভূমিকাটা প্রবল। তারপরে স্কুল-কলেজে গান শেখার সুযোগ কি হয়েছে ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : রংপুরে সেই দাদুর স্কুল, আমি জানি না আপনার মনে আছে কি না, একজন বিপ্লবী ছিলেন, তাঁর নাম ছিল ফণিভূষণ রায়। ওটা একটা পাঠশালার মতো ছিল। ওটাই ছিল আমার প্রথম স্কুল। তখন ওখানে পাঠশালায় যেতাম, যেখানে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অ, আ শেখায়। ওটাই মনে আছে। তারপর ঢাকায় এসে ভর্তি হলাম লিটল এঞ্জেলসে। এরপর ভর্তি হলাম আজিমপুর স্কুলে। তারপর ভর্তি হলাম ধানমণ্ডি গভর্নমেন্ট গার্লস হাই স্কুলে। ওখান থেকে ম্যাট্রিক পাশ করলাম। কিন্তু গান শেখা শুরু হলো ধানমণ্ডি স্কুলে। বোধহয় তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। যেটা হলো, ১৯৬৬ কিংবা ’৬৭ সালে, আমার ফুপু এবং ফুপা দুজনেরই গানের প্রতি উৎসাহ ছিল, ফুপু ছায়ানটে ভর্তি হলেন ওই বয়সে। ভর্তি হওয়ার পরে ফুপু আব্বাকে ইনসিস্ট করলেন—তাহলে ওকেও ভর্তি করে দাও। তারপরে ফুপুই একদিন আমাকে নিয়ে ভর্তি করলেন। কিন্তু তখন তো যাতায়াতের এত সুযোগ-সুবিধা ছিল না। তাই বাড়ি থেকে ছায়ানটে যাওয়াটা একটা কঠিন ব্যাপার হয়ে গেল। আব্বা গাড়ি চালাতেন। শুক্রবার আর শনিবার ছিল স্কুল। ছুটির দিনে আব্বাকে নিয়ে যেতে হতো, আবার তাকে বসে থাকতে হতো, বসে থেকে আমাকে নিয়ে আসতেন। এভাবে বছরখানিক টেনেটুনে করলাম। তারপরে যাওয়া-আসার সমস্যার জন্যে ছায়ানটটা কন্টিনিউ করতে পারি নি। সেখানেই আমার প্রথম শেখা। সংগত কারণেই আমার খুব মন খারাপ, যেহেতু ছায়ানটে যেতে পারছি না। তখন আব্বা বললেন, ঠিক আছে বাসায় তোমার জন্য টিচার রেখে দিব। তখন অগ্রণী স্কুলে গান শেখাতেন মামুন স্যার। তাঁকে কে যেন রেকমেন্ড করল। তিনি আমাকে বাসায় বেশ কিছুদিন গান শেখালেন। ১৯৬৯ সালে বোধহয় ভর্তি হলাম বুলবুল একাডেমীতে, বুলবুল একাডেমী যখন ধানমণ্ডি-৭-এ এল। বাসার কাছে ছিল—রিকশায় করে যেতে পারতাম। তখন সেখানে আতিক ভাইকে পেলাম। বেশ কিছুদিন ক্লাস করলাম। তারপর শুরু হলো স্বাধীনতাযুদ্ধের আন্দোলন—হরতাল মিছিল। পরিস্থিতি এমন হলো যে যাওয়া কঠিন হয়ে গেল। আমার গান শেখার প্রবলেম হতো মেইনলি যাওয়া-আসার জন্য। তখন তো আমাদের বাবা-মা একলা ছাড়তেন না। পৌঁছে দিয়ে আসার একটা ব্যাপার ছিল। বুলবুল একাডেমী ছেড়ে দিলাম বোধহয় ১৯৭০ সালে, নভেম্বরে শুরু হয়েছিল আন্দোলন। একেবারে সবকিছু বন্ধ। তারপর থেকে আর বুলবুল একাডেমীতে যেতে পারি নি। স্বাধীনতার পরে আতিক ভাইও মারা গেলেন। আমার বুলবুল একাডেমীতে যাওয়া হলো না। ১৯৭২ সালে ম্যাট্রিক দিলাম। পড়াশোনার চাপ অনেক বেশি। যে কারণে ওটা একটু প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল বুলবুল একাডেমী যাওয়ার ক্ষেত্রে।
আনিসুজ্জামান : এসএসসি বা এইচএসসিতে বিষয় হিসেবে মিউজিক ছিল না ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : না, মিউজিক ছিল না। স্কুলেই মিউজিকটা বিষয় হিসেবে ছিল না। যে কারণে মিউজিক নেওয়ার কোনো সুযোগও ছিল না। স্বাধীনতার পরে কলেজে ঢুকলাম। কলেজে ঢোকার পরে পড়াশোনার অনেক চাপ। ওই দুই বছরে তখন ডানে বাঁয়ে তাকাবার সময় ছিল না। একে তো বাংলা মিডিয়াম স্কুল থেকে কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম ইংরেজি মিডিয়ামে। সেটা একটা আলাদা চাপ ছিল। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেই। এখন যেমন ক ইউনিট, খ ইউনিট¬—একটা পরীক্ষা দিলেই হয়ে যায়। তখন প্রত্যেক বিভাগ ধরে ধরে একেকটা পরীক্ষা দিতে হতো। জিওগ্রাফিতে দিলাম, ইকোনোমিক্সে দিলাম, হিস্ট্রিতে দিলাম, পলিটিকাল সায়েন্সে দিলাম, তারপরে সোশিউলজিতে দিলাম। অনেক বিষয়ে পরীক্ষা দিলাম। সবগুলোতে অ্যালাউ হলাম। অ্যালাউ হওয়ার পর সবাই বলল, অর্থনীতি বিষয়টা ভালো। ভাবলাম তাহলে এই বিষয়টাতে ভর্তি হই। ভর্তি হওয়ার পরে দেখি একদিন কাগজে একটি বিজ্ঞাপন। আইসিসিআর স্কলারশিপ দিচ্ছে। শান্তিনিকেতনে স্কলারশিপ দেওয়া হবে। আমি আব্বাকে বললাম, এটাতে অ্যাপ্লাই করি। আব্বা বলল, আচ্ছা ঠিক আছে, অ্যাপ্লাই করো। কারণ আব্বা শিওর ছিল এখানে কোনো সম্ভাবনা নাই। কেননা গান তো ওভাবে শিখিই নাই। আইসিসিআর একটা স্কলারশিপ দেবে, সেখানে অ্যাপ্লাই করলে সম্ভাবনা নাই, না করলে আমি আবার মন খারাপ করব তাই আব্বা বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে অ্যাপ্লাই করো। তারপর অ্যাপ্লাই করলাম। আব্বাই সবকিছু করে দিলেন। খামে ভরে পৌঁছে দিলেন। তারপরে তো ডাকল ইন্টারভিউ বোর্ডে। আব্বাই নিয়ে গেলেন সেগুনবাগিচায়, শিল্পকলা একাডেমির পুরোনো একটি বিল্ডিংয়ে, গোল বিল্ডিং, সেখানে একটি গ্যালারিও ছিল। তো সেখানে বসে থাকলাম সারাটা সময়। আমি ছিলাম, লুবনা ছিল, শম্পা ছিল। আরও অনেকে ছিল। তারপর একসময় ডাকল। ভেতরে গিয়ে দেখি এক্সপার্ট হিসেবে আছেন কলিম শরাফী। এ ছাড়া শিল্পকলার ডিজি ছিলেন, ইন্ডিয়ান হাইকমিশনার ছিলেন। তার আগে আরও ঘটনা আছে। যখন অ্যাপ্লাই করলাম, তখন তো গান ঠিকমতো গাইতে হবে। এদিকে আমি তো শুনে শুনে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাই। নোটেশন একটুখানি পড়তে পারি। বড়মামাকে দিয়ে একবার নোটেশন আনিয়ে ছিলাম কলকাতা থেকে। তখন তো ঢাকায় নোটেশন পাওয়া যেত না। তাঁর শ্বশুরবাড়ি ছিল আসামে। তো যাচ্ছিলেন বোধহয় ১৯৬৬ বা ’৬৭-তে। বড় মামার আনা সেই স্বরবিতান ছিল আমার কাছে খেলার ব্যাপার। তখন কী করব কী করব! আম্মার আবার ক্লাসমেট ছিলেন সন্জীদা খাতুন। তো আম্মাই একদিন বললেন, চলো তোমাকে নিয়ে যাই, তোমার গান শুনুক, শুনে বলুক কী অবস্থা। তখন সন্জীদা আপা থাকতেন ইউনিভার্সিটি কোয়ার্টারে। সন্জীদা আপা চার-পাঁচটা গান শুনলেন। শোনার পরে বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে। এর মধ্যে যোগাযোগ করে আমাকে শুনিয়ো। আমি কয়েকটা গান ঠিক করে দেব, যাতে ইন্টারভিউ দিতে তোমার সুবিধা হয়। কথা অনুযায়ী আমি একদিন সন্জীদা আপার কাছে গেলাম। তিনি আমাকে চার-পাঁচটা গান ঠিক করে দিলেন। ওইগুলি আমি সিরিয়াসলি প্র্যাকটিস করলাম বাসায়, ইন্টারভিউয়ের আগে। তো ইন্টারভিউ দেওয়ার একপর্যায়ে কলিম ভাই আমাকে বললেন, তোমাকে যদি স্কলারশিপটা দেই তাহলে তুমি চলে আসবে না তো ফিরে ? এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার। আমাদের আগে এই স্কলারশিপটা নিয়ে শিমূল ইউসুফ গিয়েছিল। তারপরে লুবনা গিয়েছিল। লুবনা গিয়েছিল সাউথ ইন্ডিয়ায়। ও সেখানকার খাবারদাবার খেতে না পেরে চলে এসেছিল ইনকমপ্লিট রেখে। তাই কলিম শরাফির ওই জিজ্ঞাসা। অবশ্য কলিম ভাই এমন কথা আমাকে জিজ্ঞেস করাতে আমি ভাবলাম, এটা যখন জিজ্ঞেস করছেন, তার মানে প্রথমেই আউট হয়ে যাই নি, চান্স আছে এখনো। তা আমি বললাম, আমি কিছুতেই ফিরব না, শেষ না করে ফিরবই না। এই বলে আমি ইন্টারভিউ বোর্ড থেকে বের হয়ে এলাম। এসে যখন বাসায় আব্বাকে খুলে বলছি বিষয়টি, তখন আমার নানি (নানি বেশ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মহিলা ছিলেন ডিসিশন-মেকিংয়ের ক্ষেত্রে) বললেন, ঢাকা ইউনির্ভাসিটির ইকোনোমিকস বাদ দিয়ে তুমি গান শিখতে যাবা! গান করে তুমি করবাটা কী ? আব্বারও এমন মনোভাব। সবার একই কথা—গান করে তুমি কী করবা ? গানটা ওইসময় তখনো পেশা হিসেবে নেওয়াটা অসম্ভব একটা ব্যাপার ছিল। আমি তাই তখন অত জোর দিয়ে কিছু বলতে পারি নি। তারপর দেখি একদিন বাসায় চিঠি এসেছে, আমাকে জানিয়েছে—তুমি প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হয়েছো। এখন তোমার কাগজপত্র জমা দাও। তখন তো শুরু হলো ঝামেলা। আব্বা কিছুতেই যেতে দেবে না। আর আমার নানি তখন একটা কথাই বলছিল—পড়াশোনার ভয়ে গান করতে যাইতাছ। পড়াশুনা করলা না। দেইখো গান কত কঠিন। গানের পরীক্ষা রোজ দিতে হবে। যতবার গলা খুলবা ততবার গানের পরীক্ষা। এটা আমি পরে দেখেছি, নানির কথাটা কত সত্যি ছিল। ওই মহিলার গানের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না, কিন্তু বাস্তব অবস্থাটা ঠিকই আমার সামনে তুলে ধরেছিলেন। আসলে গানের ক্ষেত্রে প্রতিবার যখনই আমি মাইক্রোফোনের সামনে বসেছি, সে একটা গান হোক বা আধখান গান হোক—কোনো অনুষ্ঠানে গলা খুলছি, সেই মুহূর্তে আমার একটা পরীক্ষা। প্রত্যেক পরীক্ষায় আমাকে পাশ করতে হবে। নয় দিন ভালো গাইলাম, একদিন যদি গানটা খারাপ হয়ে যায় তাহলে কিন্তু ছাড় নাই। শ্রোতারা বলবে—ইশ গাইতেই পারে না, কী গাইল! এটা কিন্তু সত্যি কথা। একজন রিকশাওয়ালাও বলবে, কী গায় যা-তা। এটা একটা রিয়েল পরীক্ষা, যেটা নানি কিছু না বুঝেই বলেছিল আমাকে। তো আব্বা সবার সঙ্গে একটু পরামর্শ করল। খোকন মামা তো খুব চাচ্ছিল। মামা বলল, অবশ্যই যাওয়া উচিত। তারপর আব্বাকে প্রমিজ করলাম—ঠিক আছে আমি ফিরে এসে পড়াটা শেষ করব। তখন আব্বা নিমরাজি। তার আগে জীবনে কোনোদিন বাড়ির বাইরে যাই নি। আব্বা-আম্মাকে ছাড়া বেড়াতেও যাই নি কোথাও। বাড়ির বাইরে বের হওয়ার সেটা আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। যখন গেলাম তখন ১৯৭৫ সাল। আমাদের সিলেকশনটা হয়ে গেল ১৯৭৪ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে। তারপর কাগজপত্র, চিঠি লেখালেখি, অ্যাডমিশন, ভিসা এসব করতে ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলল। তখন সমস্ত কিছু ওলটপালট হয়ে গেল। আমরা তো ভাবছি আমাদের স্কলারশিপ হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নাই। কিন্তু নভেম্বর মাসে আবার চিঠি এল যে তোমরা অত তারিখে রিপোর্ট করো। তারপরে শান্তিনিকেতনে চলে গেলাম।
আনিসুজ্জামান : শান্তিনিকেতনে শিক্ষক হিসেবে কারা ছিলেন তখন ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : শান্তিনিকেতনে যখন গেলাম সংগীতভবনের শিক্ষক ছিলেন নীলিমা সেন, অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুদেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, ভি.ভি. ওয়াঝেল ওয়ার, নিমাই চাঁদ বড়াল, ধ্রুবতারা যোশী। এঁরা ছিলেন ভোকালে। এছাড়াও গোরাদা, মঞ্জুদি, আরতি বসু, বীরেন পালিত ছিলেন। এঁরা সব শৈলজাদা’র ছাত্রছাত্রী। এঁদের পেলাম। আর মোহরদি [কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়] ছিলেন প্রিন্সিপাল। তার আগে তো মোহরদি বাংলাদেশ থেকে ঘুরে গেছেন। আর বাংলাদেশ সম্পর্কে ওঁর একটা সাংঘাতিক দুর্বলতা ছিল। সেটা আহাদ ভাইয়ের কারণে। আহাদ ভাইয়ের সঙ্গে ওঁর অল্প বয়সে একটা সুসম্পর্ক ছিল। সেজন্য বাংলাদেশ থেকে কেউ গেলে তিনি আগ বাড়িয়ে এসে কথা বলতেন, তাদের বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে খাওয়াতেন। তাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি না—খোঁজখবর নিতেন। সমস্যার সমাধান করতেন। এইসব তিনি নিজে থেকেই করতেন। তো আমাদের দেখে (আমি আর শামীমা পারভীন ছিলাম) বললেন, ও তোমরা দুজন বাংলাদেশ থেকে এসেছ ? বাহ! বেশ বেশ! ওখানে গিয়ে আবার একটা অ্যাডমিশন টেস্ট দিতে হলো। রবীন্দ্রসংগীত তো আমি গাইতে পারলাম, কিন্তু আমাকে আবার খেয়াল গাইতে বলা হলো। আমি তো ওরকম ক্লাসিকাল শিখি নাই। আমি তাই খেয়াল গাইতে পারছিলাম না। বসে আছি। তারপর আমাকে বললেন, ঠিক আছে তুমি সরগম গাও। আমি সরগম গাইলাম। গাওয়ার পর মোটামুটি হয়ে গেল। অ্যাডমিশন হয়ে গেল শান্তিনিকেতনে। তখন মোহরদি তিন দিন ক্লাস নিতেন, বাচ্চুদি [নীলিমা সেন] নিতেন বাকি তিন দিন। সপ্তাহে ছয়টা রবীন্দ্রসংগীতের এবং ক্ল্যাসিক্যালের ক্লাস হতো। আর তখন যেটা ছিল, সংগীতভবনে সেই সময় বাইরের টিচাররা এসে স্পেশাল ক্লাস নিতেন। যেমন শৈলজারঞ্জন মজুমদার, শান্তিদেব ঘোষ, সুবিনয় রায় প্রমুখ। প্রফুল্লকুমার দাশ আমাদের থিয়োরি করাতেন কলকাতা থেকে এসে। তারপর রাজ্যেশ্বর মিত্র, তিনিও কলকাতা থেকে আসতেন, এসে থিয়োরি করাতেন। নবদ্বীপ থেকে কীর্তন দাদু বলে একজন এসে আমাদের কীর্তন শেখাতেন। তাঁকে কীর্তন দাদু নামেই চিনতাম।
আনিসুজ্জামান : কত বছরের কোর্স ছিল ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : গ্র্যাজুয়েশন ছিল চার বছরের। চার বছর পর চলে এলাম। এসে আবার অ্যাপ্লাই করলাম মাস্টার্সের জন্য। তারপর আবার গিয়ে মার্স্টাস করলাম। টোটাল সবকিছু শেষটেশ করে ১৯৮১ সালের ডিসেম্বরে ফিরলাম। ছয় বছরের কোর্স।
আনিসুজ্জামান : আচ্ছা এমনিতে শোনা যায় রবীন্দ্রসংগীতের বড় বড় গুণী শিল্পীদের অনেকের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়া নিয়ে মতান্তর আছে, এটা তোদের স্পর্শ করে নি ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : না, আমরা তো স্টুডেন্ট ছিলাম। ওই সময় শিক্ষকেরা পরষ্পর পরষ্পরের প্রতি এত বেশি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন যে, বাইরে শিল্পীদের মধ্যে গায়নরীতি নিয়ে যে তর্ক-বিতর্ক ছিল, সেটা শান্তিনিকেতনে আমরা বুঝতেই পারি নি। বিশেষ করে যদি জর্জদার [দেবব্রত বিশ্বাস] কথা বলেন। যাই হোক, পরে ১৯৯১ সালে আবার গেলাম। তখন তো মোহরদির বাড়ির পাশেই থাকতাম। ওঁর সঙ্গে অন্যরকম বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তখন মোহরদি অলরেডি রিটায়ার করে গেছেন, অসুস্থ। একা থাকেন। যেহেতু আমি সারাক্ষণ তাঁর বাসায় থাকি—আমি ছিলাম তাঁর সঙ্গী। অনেক রকমের গল্প করতেন—ওঁর জীবনের, রবীন্দ্রনাথের গান সম্পর্কিত। তখন একদিন আমাকে বলছিলেন, জানো আমি তো বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের মেম্বার ছিলাম। বিশ্বভারতীর মিউজিক বোর্ডে অনুমতির জন্য গান জমা পড়লে—সে গানগুলো পাশ করার জন্য আমার কাছে আসত। একবার নাকি দেবব্রত বিশ্বাসের গান এসেছে ওঁর কাছে, রেকর্ড বের হবে, ক্লিয়ারেন্সের জন্য। মোহরদি বললেন, আমি কানে হাত দিয়েছিলাম। জর্জদার গান আমি বিচার করব ? আমার এত বড় সাহস! এক্ষেত্রে জাস্ট চিঠি দিতে হয়। তাই চিঠিতে জানিয়ে দিলাম—সব ঠিক আছে। তো এরকম কিশোরকুমারের, আশা ভোঁসলের গান—সব এসেছিল ওঁর কাছে। বললেন, আমি সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছি। কিশোরের গান আমার বিচার করার ক্ষমতা নেই। এটা আমি ওইসময় ওঁর কাছ থেকে শুনেছি, ওঁদের যে দৃষ্টিভঙ্গি সেটা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের গান এই শিল্পীরা গেয়েছেন শ্রদ্ধাভরে। সেটাই তো রবীন্দ্রনাথের প্রতি একটা শ্রদ্ধা। আমরা যখন শান্তিনিকেতনে আশ্রমিক এবং আছি মানে বিশ্বভারতীর কর্মী, যারা রবীন্দ্রনাথের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ, আমরা সেটা বিচার করার কে—ভুল গাইছে না ভালো গাইছে ? আমরা নিজেরাও তো গান করবার সময় সব সময় সঠিক গাই না। অনেক সময় এদিক-ওদিক হয়ে যায়। কাজেই এই গানটা গ্রহণযোগ্য কি না সেটা একমাত্র বিচার করবে সময় আর বিচার করবে শ্রোতা। শুনে যদি তাদের ভালো লাগে, গ্রহণ করবে, ভালো না লাগলে গ্রহণ করবে না। এই ছিল মোহরদির মনোভাব।
আনিসুজ্জামান : কিন্তু এর আগেও তো ইন্দিরা দেবী যেমন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বরলিপি এবং সুর অনুমোদন করতেন না। ইন্দিরা দেবীর চিঠি আছে রবীন্দ্রনাথকে লেখা যে, দিনু ভুল সুর শেখাচ্ছে। যখন রবীন্দ্রনাথ কিছু করলেন না, আবার উনি বলছেন, আপনি কিছু করলেন না! এগুলোর কারণ কি ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : আমার নিজের ধারণা হলো, এটা পারসন টু পারসন ভ্যারি করে। ইন্দিরা দেবী রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনে, পূর্ববাংলা পর্বে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন—চিঠি লেখালেখি, ওঠা বসা, তৎকালীন লিখিত গানের স্বরলিপি করা সবকিছুতে। তারপর রবীন্দ্রনাথ যখন শান্তিনিকেতনে চলে গেলেন, ইন্দিরা দেবীর বিয়ে হয়ে গেল প্রমথ চৌধুরীর সাথে, তখন যোগাযোগটা অনেকটাই কমে গিয়েছিল। শান্তিনিকেতনে দিনু ঠাকুর থাকতে এলেন। তখন সমস্ত যোগাযোগ, ছাত্রছাত্রীদের গানে সুর তোলানো—দিনুর সাথে রবীন্দ্রনাথের চলছে এবং শান্তিনিকেতনে গান শেখানো কিন্তু রবীন্দ্রনাথের অনুমোদনক্রমেই হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ দিনু ঠাকুরের শেখানো সুরটিকে স্বীকৃতিও দিয়েছেন। যে গানের প্রসঙ্গে আপনি বলছেন সে গানটি হলো : “বিশ্ববীণা রবে বিশ্বজন মহিছে”—এর মূল গানটি “নাদবিদ্যা পরব্রহ্মরস”—ইন্দিরা দেবী দক্ষিণ ভারত থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। এটি মতঙ্গের মহারাষ্ট্রীয় প্রবন্ধ গান। শিলাইদহে বসে বসে রবীন্দ্রনাথ এ গানটিতে কথা বসান। দিনেন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে ছেলেদের এই গানটি একটু ভিন্ন সুরে শেখান। তা নিয়েই ইন্দিরা দেবীর একটু আপত্তি ছিল। ওই সময় এই যে ইন্দিরা দেবী দেখলেন—ভুল সুরে গাইছে, এরকম ঘটনা কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জীবনে বহুবার ঘটেছে। প্রথমে ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, তারপরে এলেন ইন্দিরা দেবী, তারপরে ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের কাঙ্গালীচরণ সেন, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সরলা দেবী। এই দুইজন ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গীতের স্বরলিপি করতেন। শান্তিনিকেতনে আসার পরে প্রথম অবস্থায় এটি করতেন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। দিনেন্দ্রনাথের গলায় কাজ কম ছিল, ফ্ল্যাট গলা ছিল। আর ইন্দিরা দেবীর গলায় সূক্ষ্ম কাজ ছিল। যে জিনিসটা রবীন্দ্রনাথ চাইতেন, সেই জিনিসটা ইন্দিরা দেবীর ছিল। দিনেন্দ্রনাথের অতটা ছিল না। আবার শৈলজাদার গলায় খুব ছিল। যে কারণে নোটেশন যখন যাঁরা করেছেন, তখন ওইখানে ভ্যারিয়েশনগুলো হয়েছে। যার গলায় কাজ নাই, সে তো কাজ দেবে না। যার গলায় কাজ আছে, সে দেবে। এই কারণে আবার একই গানে সুরান্তর ঘটেছে। যখন কলকাতায় রবীন্দ্রনাথের মোটামুটি চলাফেরা, সে সময় গানের স্বরলিপি করেছেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, সরলা দেবী, ইন্দিরা দেবী, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাঙ্গালীচরণ সেন—মূলত এই পাঁচজন। শান্তিনিকেতনে আসার পর প্রথম অবস্থায় দিনেন্দ্রনাথ, ভীমরাও শাস্ত্রী (মারাঠী বীণকার), অনাদিকুমার দস্তিদার, রমা মজুমদার ও শান্তিদেব ঘোষ তো ছিলেনই। এঁরা মোটামুটি আশপাশে ছিলেন। স্বরলিপি ওঁদের করা। ওঁদের মধ্যে আবার ইন্দিরা দেবী, শৈলজাদা—ওঁদের গলায় খুব বেশি অলঙ্কার। শান্তিদার গলায় অতটা ছিল না। ওঁরা যখন গানের স্বরলিপি করেছেন, তখন একই স্বরলিপির ক্ষেত্রে পার্থক্য দেখা গেছে।
আনিসুজ্জামান : শৈলজারঞ্জন এবং শান্তিদেব ঘোষের মধ্যে মতান্তর, সেটা কি গলার কারণেই, না আরও কিছু ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : না, না। ওঁদের দুজনের ব্যক্তিত্বের একটা সমস্যা ছিল। শান্তিদা কিন্তু জন্ম থেকেই আশ্রমিক। আশ্রমেই জন্ম-কর্ম। তাঁর পিতা কালীমোহন ঘোষকে রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গ থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। শৈলজাদা বহুপরে রসায়নে মাস্টার্স করে শান্তিনিকেতনে যান এবং খুব তাড়াতাড়ি রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। তাই তাকে সংগীতভবনের অধ্যক্ষ নিযুক্ত করা হয়। শান্তিদা-শৈলজাদা দুজনের মধ্যে ব্যক্তিত্বের বিরোধ ছিল। মোহরদির কাছে শুনেছি যে শান্তিদাকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ শেষের দিকে একটু বিব্রত বোধ করতেন। বিশেষ করে তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে। যে কারণে তাঁকে দক্ষিণ ভারত ও বালিতে পাঠিয়েছেন নাচ শিখতে, শ্রীলংকায় পাঠিয়েছিলেন নাচ শিখতে। তাঁকে শান্তিনিকেতনের আশ্রমের বাইরে রাখার চেষ্টা করেছেন। বলেছেন—তুমি নাচটা শিখে আসো, বাইরে যাও। কেননা তাঁকে নিয়ে খালি অশান্তি——এর সাথে ঝগড়া, ওকে বকা। মোহরদির কাছে শোনা—একবার ‘তাসের দেশে’র মহড়া হচ্ছে উদয়নে। আর উদীচিতে জানালার ধারে বসে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন। ওই রিহার্সেলের মধ্যে একটা গান ছিল—‘কেন নয়ন আপনি ভেসে যায় জলে’। গানটা মোহরদিকে দেওয়া হয়েছে গাইবার জন্য। তো শান্তিদা ‘গানটা ঠিক হয় নি’ বলে মোহরদিকে বকাবকি করলেন রিহার্সেলের মধ্যে সবার সামনে। মোহরদি কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে এলেন। যখন উদয়ন থেকে খোয়া বিছানো কাঁকড়ের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, তখন রবীন্দ্রনাথ জানালা দিয়ে দেখলেন। ‘এই মোহর, এই দিকে আয়’ বলে ডাকলেন। বললেন, কাঁদছিস কেন ? তখন মোহরদি বললেন, দেখুন গুরুদেব, আমাকে শান্তিদা সবার সামনে যা নয় তাই বলে বকেছেন। তখন রবীন্দ্রনাথ বললেন, কেন ? মোহরদি ঘটনা খুলে বললেন। কোন গান ? রবীন্দ্রনাথ আবার জিজ্ঞেস করলেন। মোহরদি গানটার নাম বললেন। রবীন্দ্রনাথ বললেন, আয় ভেতরে আয়, আমি তোকে শিখিয়ে দিচ্ছি। পরে রবীন্দ্রনাথ নিজে ওঁকে শিখিয়ে দিলেন, খুব সহজ সুরে শিখিয়ে দিলেন। তখন মোহরদির বয়স বেশি না, ১৩-১৪ বছর বয়স। মোহরদি তখন রবীন্দ্রনাথের শেখানো গানটিই অনুষ্ঠানে গাইলেন, মানে ‘তাসের দেশে’। দ্বিতীয় সুরটা। রবীন্দ্রনাথ তখন পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন, বলেছিলেন—শান্তির ওই সুর-টুর তোর করার দরকার নেই, তুই এটা কর। এই দ্বিতীয় সুরটা কিন্তু স্বরলিপিতে মুদ্রিত নেই। কিন্তু মোহরদি রেকর্ড করে গেছেন।
আনিসুজ্জামান : রবীন্দ্রনাথের আরও অনেক গানে তো দ্বিতীয় সুর আছে।
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : হ্যাঁ, আরও অনেক গানে আছে। ইন্দিরা দেবী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, সরলা দেবী—এই তিনজন তিনরকম করে স্বরলিপি করেছেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথেরটা ‘স্বরলিপি গীতিমালা’, সরলা দেবীরটা ‘শতগান’, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরেরটা ‘সংগীতবিজ্ঞান’ এবং ইন্দিরা দেবীরটা সমসাময়িক পত্রিকায় প্রকাশ হয়। এঁরা প্রত্যেকে যার যার মতো করে স্বরলিপি করেছেন, তাতে অনেক ডিফারেন্স হয়ে গেছে।
আনিসুজ্জামান : সুরের এই বিরোধ ছাত্রী হিসেবে তোদের অ্যাফেক্ট করত না ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : না। কারণ আমরা তো ওঁদের পাই নি। আমরা যখন যাঁদের শিক্ষক হিসেবে পেলাম—মোহরদিকে আবার শান্তিনিকেতনে সবাই অসম্ভব সম্মান করত। মোহরদি কিছু বললে কেউ না করত না। রবীন্দ্রনাথের খুব জনপ্রিয় গান আছে, যেমন ‘বরিষ ধারা মাঝে’। ব্রাহ্মসমাজের মাঘোৎসবের জন্য এটি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তখন তাঁর বয়স ২২ বছর। ওটার প্রথম স্বরলিপি করেন কাঙ্গালীচরণ সেন। ত্রিতালে বাঁধা ভৈরবী রাগে ১৬ মাত্রার ছন্দ। তারপর বহু পরে শান্তিনিকেতন পর্বে যখন মোহরদি আমাকে শেখালেন, তখন অন্যরকম সুর। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা তো স্বরলিপিতে অন্যরকম সুরে আছে। মোহরদি বললেন, শৈলজাদা আমাদের এভাবে শিখিয়েছেন এবং শান্তিনিকেতনে সবাই এই সুরটাই অনুসরণ করে। ওই সুরটা আমি শিখে নিলাম কাহারবা তালে। সুরটা সহজ। আগেরটা যেরকম মোর ক্ল্যাসিক্যাল, পরেরটা মোর ফোক-ওরিয়েন্টেড—লোকসংগীতের ধরন সুরটায়। সেটি মোহরদির কাছে শিখলাম। মোহরদি বললেন, জানো তো শৈলজাদা আমাদের যখন গান শিখিয়েছেন তখন নতুন সুরগুলো স্বরলিপিতে বের হয় নি। মানে হয়তো গুরুদের কাছ থেকে শিখে এসেছেন বা রবীন্দ্রনাথ শিখিয়েছেন। সেগুলো শিখে, লম্বা একটা খেরোখাতা ছিল তাঁর, লাল রঙের, সেটার মধ্যে সাথে সাথে শৈলজাদা লিখে রাখতেন স্বরলিপিটা। ওটা সংগীতভবনের লাইব্রেরিতে রাখা ছিল। কোনো একসময়, সম্ভবত ১৯৬০ সালের দিকে, সংগীতভবনের লাইব্রেরিতে আগুন লাগে এবং ওই লাল খাতাটা পুড়ে যায়। ফলে পুরো রেকর্ড নষ্ট হয়ে যায়। পরে আমি এই কথাটা মুনিয়াদি (আলপনা রায় চৌধুরী)—ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম। উনি বললেন, হ্যাঁ, সত্যি ঘটনা, মোহর মাসি একদম ঠিক বলেছেন। শৈলজাদা আমাদের গান শিখিয়ে সাথে সাথে লিখে রাখতেন এবং কখনো কখনো ভুলে গেলে বলতেন—ওই লালখাতাটা নিয়ে আয় লাইব্রেরি থেকে। লালখাতাটা নিয়ে এলে তিনি দেখে তারপর ওভাবে করাতেন।
স্বরলিপিতে নেই বলে, এখন যারা সংগীতভবনে গান শেখান—তাঁরা তো বেশির ভাগ বাইরে থেকে গেছেন—তাঁরা এই সুরগুলো হয়তো শেখেন নি। আগের স্বরলিপি দেখে পুরোনো সুরটাই করাচ্ছেন। মোহরদিকে আমি একবার ইনসিস্ট করলাম যে, আপনি এই গানগুলো করেন যেগুলোর কোনো অথেনটিক সোর্স নেই। আপনি চলে যাওয়ার পরে যদি আমরা এই গানগুলো গাই, সবাই বলবে—তুমি ভুল সুরে গাইছো। এটা কোথায় পেলে ? আপনি এগুলো রেকর্ড করে যান। তখন উনি এইচএমভিতে বেশ কয়েকটা গান—‘বরিষ ধারা মাঝে’, ‘ওগো আমার প্রাণের ঠাকুর’, ‘আমি মারের সাগর পাড়ি দেব’, ‘কবে তুমি আসবে বলে’ এগুলো রেকর্ড করলেন। এগুলো স্বরলিপির সাথে মেলে না। এখন আমার যেটা মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের ২২ বছর বয়সে লেখা একটা গান তো ৭০-৭৫ বছর বয়সে এক থাকতে পারে না। হয়তো তিনি সুরটা ভুলে গিয়েছেন তাই শৈলজাদাকে ভিন্নভাবে শিখিয়েছেন। শৈলজাদা আবার ওটা সবাইকে ওভাবে শিখিয়েছেন। কারণ শান্তিনিকেতন পর্ব শুরু হওয়ার পর থেকে রবীন্দ্রনাথের গানের চর্চাটা নতুন রকম ধারাবাহিকতায় শুরু হয়েছে, যেটা আগে ছিল না। ‘রবিচ্ছায়া’র ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ বলছেন—অনেকগুলো গানে সুরারোপ করেন নি, আগ্রহী যারা তারা এগুলোতে নিজেরা সুরারোপ করে নিতে পারে—এই পারমিশন কিন্তু ‘রবিচ্ছায়া’র ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ নিজেই দিয়ে গেছেন। কিন্তু আবার যখন পরিণত বয়সে দিলীপকুমার রায়ের সাথে কথাবার্তা হচ্ছে তখন বলছেন—‘না, আমার গানে এমন কোনো কিছু কমতি রাখি নি যেটা অন্যজন ভরিয়ে দেবে। কাজেই আমার গানের ওপরে স্টিম রোলার চালানো হোক—এটা আমি কখনো চাই না।’ রবীন্দ্রনাথ স্পষ্টতই তাঁর মত পরবর্তীকালে পরিবর্তন করেছেন। রবীন্দ্রনাথের নিজের কথার মধ্যে কনফিউশন আছে।
আনিসুজ্জামান : এভাবে গুরুপরম্পরায় যা শেখানো হচ্ছে আর স্বরলিপিতে যা লেখা আছে, এর মধ্যে বিরোধ হলে সমস্যা হয়ে যাবে না ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : খুবই সমস্যা হচ্ছে। এখন অনেকে আছেন যাঁরা বিষয়টা জানে না। তাঁরা স্বররিপির সুরটাকেই একমাত্র এবং অনিবার্য সুর হিসেবে ধরে নেন। কাজেই যখন দ্বিতীয় কোন সুর তাঁরা শোনেন, তখন সেটা অনায়াসেই ভুল সুর হিসেবে বিবেচনা করেন। হ্যাঁ, এটা হতেই পারে। কারণ গুরুপরম্পরায় শিখবার অভিজ্ঞতা তো সকলের হয় না। এ বিষয়ে একটা মজার গল্প আছে। রবীন্দ্রনাথের একদম পরিণত বয়সে বর্ষামঙ্গল উদ্যাপন উপলক্ষে ১৯৩৯ সালে রবীন্দ্রনাথ গান লিখলেন ‘আজি ঝরঝর মুখর বাদর-দিনে’। সুর করলেন ষষ্ঠী তালের ওপরে। যখন বর্ষামঙ্গলের মহড়া হচ্ছে, ছেলেমেয়েরা গাইছে, তার সাথে নাচ কম্পোজ করা হচ্ছে, শৈলজাদা গানগুলো করাচ্ছেন। রবীন্দ্রনাথও উপস্থিত আছেন সেখানে। মহড়া হয়ে যাওয়ার পরে রবীন্দ্রনাথ শৈলজাদাকে ডেকে বললেন, এই সুরটা মনে হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের নাচে খুব একটা ছন্দ পাচ্ছে না। ছন্দটা পাল্টিয়ে দিলে কেমন হয় ? রবীন্দ্রনাথ সাথে সাথে পরের মহড়ায় পাল্টে ২+২ ছন্দে করে দিলেন। ওই সুরটা ছাত্রছাত্রীদের খুব পছন্দ হলো। সবাই হইহই করে গাইল, নাচটাও খুব সুন্দর হলো। প্রথম সুরটা রবীন্দ্রনাথ বাদ দিয়ে দিলেন। পরের সুরটা চালু হয়ে গেল। ওই গানটা খুবই জনপ্রিয় হলো। শান্তিনিকেতনের সবার মুখে মুখে সুরটা। শৈলজাদা তো এটা জানে। শৈলজাদা যাঁদের শেখালেন—মোহরদি, বাচ্চুদি—দুটো সুরই শেখালেন। একবার রেডিও প্রোগ্রামে মোহরদি অনুষ্ঠান করতে গেছেন, এই গানটা করেছেন। গান করে রিকশাতে ফিরে আসছেন, ভুবনডাঙ্গার মোড়ে তখন রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাইকেলে বোলপুর যাচ্ছেন। তখন দুজনের দেখা হলো। রথীদা মোহরদিকে দেখে সাইকেল থামিয়েছেন। ফলে মোহরদিও রিকশা থামান। রথীদা বললেন, এই মোহর, কাল তোর গান শুনলাম (তখন আকাশবাণীতে রেকর্ডিং সিস্টেম ছিল না। একদিনে একজন শিল্পীকে তিনটা অনুষ্ঠান দেওয়া হতো—সকাল ৮টার সময়, ওখানে ১০ মিনিট। আবার ১.৩০ থেকে ২টার মধ্যে ১০ মিনিট, আবার সন্ধ্যায় একটা। যারা করত সকাল থেকে তিনটা প্রোগ্রাম করে পরের দিন ফিরত। মোহরদি ওভাবে ফিরছেন পরের দিন)। মোহরদি যখন আশা করছেন কোনো প্রশংসাবাচক কথা শুনবেন তখন রথীদা বলছেন, তোদের এত সাহস কী করে হয় রে ? বাবা গত হয়েছেন এখনো পাঁচ বছর হয় নি। এর মধ্যেই তোরা নিজেরা সুর করে গান করা শুরু করে দিয়েছিস! মোহরদি তো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছেন। কোন গানটার কথা বলছেন রথীদা? তখন রথীদা বলছেন, ‘আজি ঝরঝর মুখর বাদর-দিনে’। তখন মোহরদি খুব কাঁদতে শুরু করেছেন বকা খেয়ে। অনেকক্ষণ পরে বললেন, আমাকে তো শৈলজাদা এভাবে শিখিয়েছেন। শৈলজাদার কথা শুনে তখন রথীদা আর কিছু বললেন না। গজগজ করতে করতে সাইকেল নিয়ে চলে গেলেন। বললেন, ‘যার যা ইচ্ছা তাই করছে, শান্তিনিকেতন আর শান্তিনিকেতন নেই।’ পরে ওখান থেকে মোহরদি সোজা চলে গেলেন শৈলজাদার কাছে। গিয়ে মোহরদি বললেন, শৈলজাদা, আমাদের কী সুর শিখিয়েছেন ? রথীদার কাছে রাস্তার মাঝে বকা খেলাম। শৈলজাদা হেসে বললেন, রথীবাবু জানেনই না এই সুরটার কথা। আগেই বলেছি, বর্ষামঙ্গলের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ সুরটা পরিবর্তন করে এই সুরটা করেছিলেন। তারপরে অনুষ্ঠানে দ্বিতীয় সুরটাই গাওয়া হলো এবং ছেলেমেয়েদের মুখে মুখে ফিরতে লাগল দ্বিতীয় সুরটা। এটা খুব ক্যাচি একটা সুর। এই যে সুরের সুরান্তর এটা যাদের জানা আছে, জানা আছে। না জানা থাকলে তখন অনেকরকম বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অনায়াসে বলে বসে—ভুল সুর। জানার চেষ্টা করে না—এটা তুমি কোথা থেকে পেলে, কেমন করে পেলে ? এখন অবশ্য ওই গানের দুটো সুরই স্বরলিপিতে রয়েছে।
আনিসুজ্জামান : শান্তিনিকেতনে যারা গান শিখতে যায়, তাদের তো ক্ল্যাসিক্যাল খুব ভালোভাবে শিখতে হয়। রবীন্দ্রনাথ নিজেও শিখেছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রসংগীতের প্রথম দিকে ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের প্রভাব অত দেখি না যতটা পাশ্চাত্য সুরের প্রভাব দেখি। কারণ কী ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : পাশ্চাত্য সুরের প্রভাবিত গানের সংখ্যা খুবই কম। সর্বসাকুল্যে ৮-১০ খানা হবে। কিন্তু সবগুলোই খুব জনপ্রিয়। আমরা জানি যে, এই গানগুলো পাশ্চাত্য সুরের গান। কিন্তু প্রথম দিকে পূর্ববঙ্গে আসার আগ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের শিক্ষানবীশকালীন করা সব সুরই কিন্তু (৯০ ভাগ সুর) রাগাশ্রিত ছিল, ভাঙা গান মানে ওই সময় যাঁরা গাইয়ে ছিলেন—রাধিকা গোস্বামী, যদুভট্ট, রামপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়, বিষ্ণু চক্রবর্তীসহ আরও ওই সময়ের বিখ্যাত গাইয়েরা, তাঁদের যে ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুমরির বন্দিশগুলো, রবীন্দ্রনাথ মূলত ওই বন্দিশে একই রাগে একই ছন্দে বাংলায় কথা বসিয়ে গিয়েছেন। বিষয় বা ভাবের কিছু তারতম্য রয়েছে। তবে হিন্দি রাগসংগীতের আদলে তৈরি হলেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজস্ব নান্দনিকতায় এ গানগুলিকে রাগরাগিণীর কাঠামোর বাইরে নিয়ে এসে, সম্পূর্ণভাবে নিজের গান হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। যেমন ‘রুমা ঝুমা বরষে’ গানটি। যদুভট্টের লেখা কাফি রাগের, সুরফাঁক তালের এই ধ্রুপদটি ভেঙে দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ—সবাই ব্রহ্মসংগীত রচনা করেছেন। প্রথমে ভাঙলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ। ভেঙে ওটার ওপর বাংলায় কথা বসালেন। যদুভট্টের গানের বিষয়বস্তু বর্ষা। দ্বিজেন্দ্রনাথের গানটিরও বিষয়বস্তু বর্ষা। তারপরে জ্যোতিরিন্দ্রনাথও ভাঙলেন। গানটির বিষয়বস্তু একই রইল। তবে উনি ছন্দটা পরিবর্তন করলেন। মূল গানটি ছিল সুরফাঁক তালে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সেটিকে পরিবর্তন করে চৌতালে আনলেন। দুই দুই করে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাকে পূজা পর্যায়ের গানে রূপান্তর করে দিলেন। তারপরে রবীন্দ্রনাথ পরিবর্তন করলেন, সুরের গঠন একদম হুবহু কিন্তু বিষয়টা পাল্টে গেল। ওটা হয়ে গেল ব্রহ্মসংগীত। ব্রহ্মসংগীত হওয়ার কারণ রবীন্দ্রনাথ তখন তো ফরমায়েশি গান লিখছেন। ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদকের দায়িত্ব নেবার পর তাঁকে ১১ মাঘ মাঘোৎসবের জন্য গান লিখে, সুর করে, অন্যদের জন্য তৈরি করতে হতো। এভাবেই কিন্তু তাঁর সংগীতকার হয়ে ওঠার সূচনা। জমিদারি দেখাশোনা করার জন্য পূর্ববঙ্গে থাকতে হচ্ছে। পূর্ববঙ্গে যখন ঘুরছেন তখন নিজস্ব রচনাশৈলী নিয়ে মগ্ন থাকছেন। ফিরে দশ-এগারো দিনের মধ্যে ২২-২৩টা গান করতে হতো। এর সবই ধ্রুপদ, খেয়াল কিংবা কোনো প্রাদেশিক সুরভাঙা রাগাশ্রয়ী গান। শুধু উত্তর ভারতের রাগসংগীত নয়, দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন গান শুনে শুনে রবীন্দ্রনাথ সেগুলোও ভেঙেছেন। লক্ষণীয় যে, যখন পূর্ববঙ্গে থাকছেন, তখন প্রেম-প্রকৃতি-পূজা পর্যায়ের গান লিখছেন। আবার যখন কলকাতায় আসছেন তখন রাগাশ্রয়ী ভাঙা গানের আদলে প্রচুর ব্রহ্মসংগীত তৈরি করে ফেলছেন। মাঘোৎসবের পরপরই আদি ব্রাহ্ম সমাজের তত্ত্বাবধানে এই সমস্ত গানের স্বরলিপি বের হতো তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায়। এই সময়ে রচিত পূজা পর্বের গানে তিনি বিভিন্ন রাগ-রাগিণী, বিভিন্ন ধ্রুপদী তাল এবং বিভিন্ন ধ্রুপদী আঙ্গিক, যেমন—ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল, টপ্পা, ঠুমরি, তারানা, ত্রিবট প্রভৃতি ভেঙে ব্রহ্মসংগীত রচনা করেছেন। ১৮৯১ সালে পূর্ববঙ্গে যাতায়াতের পর থেকেই তাঁর গান রচনায় মৌলিকতা, নিজের ভাবনা, নিজস্ব চলন ইত্যাদি প্রকাশ পেতে শুরু করে। আর পরিণত বয়সে এসে রাগসংগীত, বাংলার লোকসংগীত—কীর্তন, বাউল এবং পাশ্চাত্য চলন—জ্যাজ মিউজিক, চার্চ মিউজিক সবকিছু মিলিয়ে একটা ব্লেন্ড করেছেন।
আনিসুজ্জামান : শান্তিনিকেতন থেকে ঢাকায় এলি কত সালে ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : ১৯৮১ সালের ডিসেম্বর ফিরে এলাম।
আনিসুজ্জামান : তারপরে গানের ক্ষেত্রে কী করলি ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : তখন এসে ছায়ানটে জয়েন করলাম, তারপর মিউজিক কলেজে চাকরি নিলাম। সংগীতভবন তৈরি করলাম আমরা নিজেরা মিলে। ইতিমধ্যে ১৯৮৬ সালে ১২৫তম জন্মবার্ষিকী রবীন্দ্রনাথের। লন্ডনে হলো বিশাল বড় অনুষ্ঠান। ঢাকা-কলকাতা দুই জায়গা থেকে প্রচুর শিল্পীরা গেলেন। সেখানে মোহরদি গিয়েছিলেন, গোরাদাকে [গোরা সর্বাধিকারী] নিয়ে। আমি ১৯৮১ সালে ফিরে আসার পর ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত আর শান্তিনিকেতনে যেতে পারি নি। কারণ এর মধ্যে আমার বিয়ে হলো, বাচ্চা হলো। এখানেও স্ট্রাগলিং। চাকরি খুঁজছি। ১৯৮৬ সালে আবার মোহরদির সাথে দেখা হলো। দেখলাম মোহরদি আর আগের মোহরদি নেই। অনেকটাই বুড়িয়ে গেছেন। অথচ আগে মোহরদি যথেষ্ট অ্যাকটিভ ছিলেন। কলকাতায় প্রোগ্রাম করতে যাচ্ছেন, সব জায়গায় যাচ্ছেন। ১৯৮৬ সালে দেখি ওনার ঘাড় স্পনডিলাইটিজে স্টিফ হয়ে গেছে। হাঁটু ধরে গেছে, হাঁটতে পারেন না। মাথা নিচু করতে পারেন না। একদম জবুথবু । দ্যাট ওয়াজ ভেরি শকিং আমার জন্য। কিন্তু লন্ডনে যাওয়ার পরে তিনি আমাকে দেখে খুব খুশি হলেন। মোহরদি ছিলেন লন্ডন থেকে বেশ খানিকটা দূরে। গোরাদাকে তিনি সারাদিন আটকে রাখতেন। গোরাদা একদিন বললেন, ‘তোরা এসে মোহরদির কাছে থাক। তাহলে আমি একটু বেরোতে পারি।’ তারপর আমরা গেলাম। আমি আর সাদি। জয়ন্তদা বলে একজন ছিলেন, মোহরদির খুবই ঘনিষ্ঠ, লন্ডনে গেলে মোহরদি ওঁদের বাড়িতেই থাকতেন। তো ওখানে সকালবেলা গেলাম, গিয়ে সারাদিন থাকলাম আর গোরাদা বেরিয়ে গেলেন। তখন মোহরদির সাথে অনেক গল্প হলো। মোহরদিকে বললাম, আমরা তোমাকে খুব মিস করি। মোহরদি বললেন, তোমরা তো আসতে পারো। এসে থাকো না কেন ? এখন তো আমি রিটায়ার করে গেছি, বাড়িতেই থাকি। বাইরে গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। তখন ওটা আমার মাথায় এল—মোহরদি বসা এখন। তারপর তো চলে এলাম লন্ডন থেকে। আগে মোহরদি আমাদের কাছে ছিলেন প্রিন্সিপাল, টিচার। কাজেই একটা দূরত্ব ছিল। অত কাছাকাছি যেতে পারি নি। কিন্তু ১৯৮৬ সালে ওই কয়েকদিনে মোহরদির অনেক কাছে চলে এলাম। তারপর ওখান থেকে ফিরে এলাম। অক্টোবর-নভেম্বর মাসে মোহরদি ঢাকায় এলেন, ছায়ানট নিয়ে এল বা রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ নিয়ে এল। তখন ধানমণ্ডি পাঁচ নম্বরে থাকতেন। ওই সময় মোহরদির সাথে খুব ওঠাবসা হলো। আমরা একসঙ্গে খুলনায় গেলাম। তখন যাওয়া-আসার মাঝে মোহরদি বললেন, আমি তো বসেই আছি। তোমরা এসে যদি কিছু নিতে চাও তো এখনই নাও। এটা আমাকে সাংঘাতিক নাড়া দিল। আমার তখন ছোট ছোট দুটো বাচ্চা। এটা ১৯৮৬ সালের শেষের কথা। তারপর সবকিছু গোছাতে গোছাতে আবার মোহরদির সাথে যোগাযোগ হলো। গেলাম শান্তিনিকেতনে। মোহরদিকে নিয়ে তখন একটা ডকুমেন্টারি তৈরি হচ্ছিল। গৌতম ঘোষের পরিচালনায়, নাম মোহর। মোহরদি ওখান থেকে খবর পাঠালেন—তোমরা এসো। তখন মোহরদির বাসায় প্রথম থাকলাম। তার আগ পর্যন্ত থাকি নি। দেখলাম আসলে খুব একা হয়ে গেছেন তিনি। বাইরের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে তো। খুব একা। তারপর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—যাব এক বছরের জন্য। তখন আমি মিউজিক কলেজে চাকরি করি। সরকার থেকে পারমিশন দেবে না। কলেজ থেকেও দিচ্ছে না। তখন পদত্যাগ করলাম। ভাগ্যক্রমে তখন জামিল চৌধুরী ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব। রেজিগনেশন দিয়ে জামিল ভাইকে বললাম, আমার যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। জামিল চৌধুরী মোহরদির ভীষণ অনুরাগী ভক্ত ছিলেন। তিনি আমার রেজিগনেশনটা গ্রহণ করলেন। আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে গেলাম। গিয়ে তখন ওই সময় সত্যিকার অর্থে আমি মোহরদির বাড়িতেই থাকতাম, দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে। কাজেই সারা দিন ২৪ ঘণ্টা একসঙ্গে মোহরদি আর আমি। মোহরদি তখন একদম লোনলি। ওঁর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যে সমস্ত স্মৃতি, পেশাগত জীবনের স্মৃতি, অন্য শিক্ষকদের সাথে স্মৃতি—সব ওই সময় অকপটে আমার সাথে শেয়ার করতেন। গান শেখাতেন। এবং গান শেখাতে শেখাতে আমাকে এটাও বলতেন, এগুলো লিখে রাখো। তারপরে সুরান্তরের যে ব্যাপারটা আবার আসছে, একটা স্বরলিপি বেরিয়েছে কিন্তু শান্তিদা যখন স্বরলিপি দেখছেন ওটা কেটে কেটে আবার ঠিক করে দিচ্ছেন। দিয়ে আবার নিজে সই করে ডেট দিয়েছেন। কত তারিখে চেঞ্জ করা হলো। বলছেন, এগুলো সব তোমার কাছে রাখো। যাতে পরে তোমাকে কেউ প্রশ্ন করলে বলতে পারো তুমি। সুরান্তরের ব্যাপারটা শৈলজাদা, শান্তিদা, অনাদিকুমার দস্তিদার—যাঁরা স্বরলিপি করেছেন তাঁদের সবার মধ্যে একটু একটু ছিল। মোহরদিকে সবাই খুব মান্য করত। আমার মনে আছে, নিজেই বলছেন আমাকে—এই গানটা তুমি বাচ্চুর কাছে গিয়ে করো। বাচ্চু ভালো করাতে পারবে। যেমন ‘আহা তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা’ যখন শিখতে গেলাম মোহরদি বললেন, এটা বাচ্চুর কাছে করো।
আনিসুজ্জামান : নীলিমা সেন তখন কোথায় থাকেন ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : নীলিমা সেন তখন শান্তিনিকেতনে থাকেন, পূর্বপল্লীতে। এন্ডড্রুজ পল্লীতে থাকেন মোহরদি। দুই মাথায় দুইজন। দেখা-সাক্ষাৎও কম হয়। বাচ্চুদি তখনো সংগীতভবনের প্রিন্সিপাল। মোহরদি রিটায়ার করে গেছেন। তখন আমি বিকেলবেলা বাচ্চুদির কাছে গান শিখি। মোহরদি লিস্ট করে দিলেন—এই এই গান তুমি বাচ্চুর কাছে গিয়ে শিখবে। যেমন—‘প্রভু বল বল কবে’ তারপরে ‘কী রাগিণী বাজালে’সহ অনেক গান। এগুলো বাচ্চুর কাছে করো, বাচ্চু সরাসরি শৈলজাদার কাছ থেকে শিখেছেন। ‘আহা তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা’ গানটা শিখতে গেলাম বাচ্চুদির কাছে, তখন বাচ্চুদি বললেন, এটা কিন্তু আমি স্বরলিপির মতো গাইব না, আমি শৈলজাদার কাছ থেকে সরাসরি শিখেছি। একটি ঘটনা বলি। তখন বাচ্চুদির কাছে গল্পটা শুনলাম। সেইসময়কার বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, উমা বোধহয়, নামটা মনে পড়ছে না এই মুহূর্তে, সিংহসদনে অনুষ্ঠান হচ্ছে, বসন্ত উৎসব, তিনি (উমা) যখন গান করছেন, রবীন্দ্রনাথ বসা ইজি চেয়ারে। যখন গান শুরু করেছেন, রবীন্দ্রনাথও সাথে সাথে গাইতে শুরু করে দিয়েছেন তার সাথে। তিনি তখন চুপ হয়ে গেছেন। পুরো গানটা রবীন্দ্রনাথ একাই গাইলেন—এত ভাব এসে গিয়েছিল। বাচ্চুদি বললেন, ওই শুনলাম। তখন আমি স্কুলে পড়ি। শৈলজাদাকে বললাম, আমরা শিখব। তখন শৈলজাদা রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে শিখে নিয়ে আমাদের শেখালেন।
আনিসুজ্জামান : কত দিন থাকা হয়েছিল ওই সময় ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : দেড় দু-বছরের জন্য ছিলাম। ১৯৯০ সালের শেষের দিকে গেলাম। আর ১৯৯২ সালে ফিরে এলাম।
আনিসুজ্জামান : তারপর সুরের ধারা ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : যখন মোহরদির সাথে ছিলাম তখনই মোহরদি ইনসিস্ট করলেন। বললেন, তুমি একটা কাজ করো। ঢাকায় ফিরে তোমার একটা নিজস্ব স্কুল শুরু করো। কারণ এই যে গায়কীর ধারা শৈলজাদা থেকে আমি, আমার থেকে তুমি। তোমাকে যে শিখিয়ে দিচ্ছি, যেগুলো স্বরলিপির সাথে মেলে না, এগুলো ধরে রাখা এবং বিচারের একটা দায় আছে। তাই তুমি নিজের একটা স্কুল করো। আমি তো খুব কনফিউজড ছিলাম পারব কি না। মোহরদি বললেন, খুব পারবে—কোনো অসুবিধা নেই। নামও ঠিক করে দিলেন—‘সুরের ধারা’। আসার পরে তাঁর আশীর্বাদে শুরু করলাম ‘সুরের ধারা’, ১৯৯২ সালে ফিরে এসে।
আনিসুজ্জামান : ‘সুরের ধারা’র কত বছর হলো ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : এই তো ২৫ বছর।
আনিসুজ্জামান : প্রত্যেক ব্যাচে গড়ে কত জন ছাত্রছাত্রী ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : গড়ে আমাদের ৩০ জন ৩৫ জন আসে। কিছু কিছু আবার ধরেন একদম ফাইনাল ইয়ার পর্যন্ত করল কিন্তু পরীক্ষা দিল না এমনও আছে। কিন্তু যেটা হয়েছে এখন পর্যন্ত আমাদের প্রায় দুই-তিন হাজার স্টুডেন্ট সারা বাংলাদেশে কিংবা দেশের বাইরে ছড়িয়ে আছে। সবচেয়ে বড় কথা, সবার সাথে যোগাযোগ আছে আমাদের।
আনিসুজ্জামান : সুরের ধারা পরে আরও তো একটা বড় কাজ করল—এই যে নববর্ষের প্রাক্কালে চৈত্রসংক্রান্তির সন্ধ্যা থেকে নববর্ষের সকাল পর্যন্ত। এই ধারণাটা কীভাবে এল ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : এটা হলো যে, রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতবর্ষ, ২০১১ সালে, তখন শ্রুতি গীতবিতানটা করা হলো। শ্রুতিগীতবিতানে রবীন্দ্রনাথের সব গান ঠাঁই পেয়েছে এবং আইডিয়াটা হলো যারা যারা ওটাতে গান গেয়েছে, যে কজন শিল্পী, সবাইকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাখা এবং সুন্দর একটা আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। সবাই খুবই আগ্রহী ছিল। যারা যারা শ্রুতিগীতবিতানে গান গেয়েছে, সবাই মোটামুটি অংশগ্রহণ করেছে অনুষ্ঠানটিতে। সেইসাথে ঢাকার আরও যারা শিল্পী, বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পী, তারাও এসেছে। এই করে প্রায় এক হাজারের ওপরে শিল্পী হয়ে গিয়েছিল। মফস্বল থেকে যারা গাইছে, সবাই এসেছে। তাদের আবার অনেকগুলো স্কুল আছে। তারা স্কুলের স্টুডেন্টদের নিয়ে এসেছে। যেটা প্রথমবার আমাদের কাছে খুব জটিল ছিল। এক হাজার শিল্পীকে একটা মঞ্চে দাঁড় করানো, তাদের নিয়ে গানের মহড়া দেওয়া, তাদের মঞ্চে ওঠানো—একটা বিশাল ব্যাপার। সেখানে আমাকে অনেকেই সাহায্য করেছে। যেমন ইতিমধ্যে আমাদের সাথে যোগাযোগ হয়েছে গর্ন্ধবলোক অর্কেস্ট্রা, একটি সুইস অর্কেস্টা, যারা শ্রীচিন্ময়ের অনুরাগী এবং আমার সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ ছিল। ওরাও এল আমাদের সাথে অংশগ্রহণ করতে। ওরা আমাদের সাহায্য করল—মঞ্চে সবাইকে সুন্দরভাবে ওঠানোর কাজে। আর প্রথম অনুষ্ঠান করায় দেখতে পেলাম যে, এক হাজারজনকে নিয়ে একটা অনুষ্ঠান করার অভিজ্ঞতা একটা আত্মবিশ্বাস এনে দিয়েছে। এটা অত কিছু জটিল মনে হবে না যদি আমরা আগে থেকে ট্র্যাকগুলো করে রাখি। দশটা মহড়া করি, বাচ্চাদের আগে থেকে গানগুলো পাঠিয়ে দেই। গানগুলো তুলে আট-দশটা মহড়া করলে ওরা করতে পারে। কিন্তু যেটা এখনো পারি নি, সেটা হচ্ছে যে অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পরে সবাইকে মঞ্চে ওঠানো। ওই ডিসিপ্লিনটা আমরা এখনো করতে পারি নি।
আনিসুজ্জামান : সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে একটা কার্যক্রম ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : ওইটাও খুব একটা ইন্টারেস্টিং প্রজেক্ট। আমাদের ওই পাশে, ঢাকা উদ্যানের ওইখানটায় বস্তি আছে, বছিলা বস্তি, ওখান থেকে আমরা বাচ্চা আনি। পঞ্চাশটা বাচ্চা। এটাও আমি শান্তিনিকেতন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছি। শান্তিনিকেতনে কিন্তু সাঁওতাল বাচ্চাদের নাইট স্কুল আছে, যে স্কুলে আশ্রমের শিক্ষার্থীরা গিয়ে পড়ায়। এটার ওপর ওদের একটা মার্কস আছে। কে কী রকম পড়াচ্ছে, কে কয়টা ক্লাস নিল, সেই নাইট স্কুলের স্টুডেন্টরা কেমন রেজাল্ট করল—তাদের ওপর আশ্রমের শিক্ষার্থীদের পয়েন্ট আছে এবং ওই গ্রামে চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্যসেবা—এগুলো সব ওদের স্কুলের পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত। সেইটা দেখে আমার মনে হয়েছে—আমাদের যারা বাচ্চা, রেগুলার বাচ্চা, এরা আসলে সবাই খুব প্রটেক্টেট, ওয়েল-অফ ফ্যামিলির বাচ্চা। এরা কিন্তু আসলে সুবিধাবঞ্চিত বাচ্চাদের বিষয়ে একবারেই আগ্রহী না। ওরা জানে না। ওদেরকে ছবিটা দেখানো হয় না। সেই কারণে আমরা এদেরকে আনি। তাহলে এই বাচ্চারা ওই বাচ্চাদের সাথে পরিচিত হবে। এখন আমার যেটা মনে হয়, এটা ১০০ ভাগ সফল একটা প্রজেক্ট হয়েছে। কারণ এই বাচ্চারা, রেগুলার বাচ্চারা, এই প্রজেক্ট সম্পর্কে সব জানে। ওদের মধ্যে একটা অন্য ধরনের সেনসিটিভ ব্যাপার তৈরি হয়েছে। দুই-তিনটা উদাহরণ আছে। রেগুলার বাচ্চারা স্কলারশিপের টাকা পেয়ে সুবিধাবঞ্চিত বাচ্চাদের দেয়। ওদের জন্মদিনে রেগুলার বাচ্চারা কেক-মিষ্টি নিয়ে আসে। বস্তির বাচ্চাদের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, রেগুলার বাচ্চাদের দেখে তাদের কনফিডেন্স লেভেল অনেক বেড়ে গেছে। ওরা এখন স্কুলে খুব ভালো রেজাল্ট করছে। আগে সব ড্রপ আউট হয়ে যেত। ফাইভ-সিক্সে উঠে বিশেষ করে অঙ্ক, ইংরেজি পারত না। ফলে সবাই ড্রপআউট হয়ে যেত। আমরা এখন ওদের হোমওয়ার্কগুলো করিয়ে দেই।
আনিসুজ্জামান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যোগাযোগের ব্যাপারটা ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং। ১৯৯০ সালে হঠাৎ একদিন আমাকে সন্জীদা আপা ডেকে পাঠালেন। যাওয়ার পরে তিনি আমাকে বললেন—শোন (তখন তো ভিসি ছিলেন মনিরুজ্জামান মিঞা। কলাভবনের ডিন ছিলেন মমিন চৌধুরী) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগ খোলার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। তুই একটা কাজ কর। একদিন আমাকে ডিনের কাছে নিয়ে গেলেন তিনি। মমিন চৌধুরী সাহেব বললেন, তাহলে আপনারা সিলেবাস করে আমাকে দেন। তখন মৃদুলের চাকরি হয় নি। আমি তখন মিউজিক কলেজে চাকরি করছি। চাকরি ছেড়ে দেব ছেড়ে দেব এ রকম একটা ব্যাপার। তো মৃদুল আর আমি মিলে একটা সুন্দর সিলেবাস করলাম। সন্জীদা আপা বললেন, তোরা একটা করে দে, তারপর ওটা আমি ঠিকঠাক করব। সিলেবাস করে তারপর দিলাম। দেওয়ার পরে সিন্ডিকেটে পাস হলো। লোক নেওয়ার সময় হলো। আমি তখন শান্তিনিকেতনে যাব ঠিক হয়ে গেছে। সন্জীদা আপা বলল, তাহলে মৃদুলকে আমরা নিয়ে নিই। একটা লোক তো নিতে হবে। সংগীত বিভাগ শুরু করার সময় সন্জীদা আপা বেশ ইনভলভ্ড ছিলেন। মৃদুলকে নেওয়া হলো। তখন নাট্যকলা ও সংগীত দুটো ছিল একসঙ্গে। জামিল আহমেদ আগে থেকেই ছিলেন, আর মৃদুলও ঢুকল। তারপর আমি শান্তিনিকেতন চলে গেলাম। শান্তিনিকেতন থেকে ফিরে আসার পরে মৃদুল বলল, তুমি আসো, পার্টটাইম করো। আমি ঢুকলাম প্রথমে। তখন ছিল শুধু প্রিলিমিনারি-মাস্টার্স। অনার্স খোলা হয় নি। আমরা ঢুকে অনার্সের সিলেবাস করলাম। নীলুফার আপা যোগ দিলেন। উনিও পার্টটাইম। আমরা দুজন পার্টটাইম ছিলাম। মৃদুল ছিল রেগুলার লেকচারার। আর নাট্যকলায় জামিল আহমেদ রেগুলার। আর পার্টটাইম ছিল ওয়াহিদা মল্লিক জলি। আর শাহীন ঘোরাফেরা করছিল। ইস্রাফিল শাহীন। সে পার্টটাইম ছিল। এইভাবে শুরু করলাম। প্রথমে প্রিলিমিনারি দুই বছর করার পরে অনার্স প্রথম ব্যাচটা ভর্তি করলাম। তারপর থেকে তো মোটামুটি ভালোই চলছে। দুবছর আগে আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, তিনি বললেন যে, আমরা নৃত্যকলা বিভাগটা খুলতে চাই, আপনাকে আমি অফার করছি এই বিভাগের চেয়ারপার্সন হওয়ার জন্য। আপনি ভেবে আমাকে বলেন। আমি বললাম, ঠিক আছে। তারপর স্যারকে বললাম, আমি তো নাচের কিছুই জানি না। তিনি তখন বললেন, এটা আসলে অ্যাডমিনিসট্রেটিভ জব। আপনি পার্টটাইম টিচার নেবেন। নেওয়ার কাজটা আপনি করেন, ডিপার্টমেন্টটাকে গুছিয়ে দেন। আর দেখুন সময়টা আপনি কীভাবে ম্যানেজ করতে পারেন। তখন বাসায় এসে চিন্তাভাবনা করলাম। ডিন স্যারের সাথে কথা বললাম। ইতিমধ্যে মৃদুল মারা গেছে। সংগীত বিভাগের পরিবেশটা ঠিক আমরা যেভাবে শুরু করেছিলাম, তার থেকে আস্তে আস্তে অন্যরকম হয়ে যাচ্ছিল। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম কিন্তু কিছু করার ছিল না। নিজেদের তৈরি করা জিনিস, বোঝা যাচ্ছে চলে যাচ্ছে, আমার হাতে আর নেই। সেটা দেখাও খুব কষ্টকর, একটা অসম্ভব মনোকষ্টের কারণ হয়। কাজেই তখন আমি ভাবলাম—দূরেই সরে যাই। সেটা আমার জন্যে ভালো হবে। তখন আরেফিন স্যারকে বললাম, ঠিক আছে।
আনিসুজ্জামান : শান্তিদেব ঘোষের মতো হলো। সংগীত থেকে নৃত্যে।
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : তারপর তো নৃত্য বিভাগে এলাম। এখন আবার ভালো লাগছে—একটা বিভাগ গোছানোর ব্যাপারটি ইন্টারেস্টিং, আর যেহেতু এখনো ছোট আছে।
আনিসুজ্জামান : কতজন শিক্ষক আছে ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : এখন তিনজন শিক্ষক। তিনজনই লেকচারার।
আনিসুজ্জামান : ছাত্রছাত্রী কত জন ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : ছাত্রছাত্রী প্রায় ৬৫ জনের মতো। তিনটা ব্যাচ আছে আমাদের। মাত্র দুই বছর শুরু হয়েছে। এ বছর আরও নেব।
আনিসুজ্জামান : অনার্স নাকি ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : হ্যাঁ, সবাই অনার্স। আমরা এখন কারিকুলাম করা থেকে শুরু করে সমস্ত কিছুই করছি। বিভাগের আয়তন বাড়ানোর জন্য রুম করার চেষ্টা করছি। আর নাচের যেটা হয়, নাচের স্টুডেন্টদের সাথে টিচারদের সম্পর্কটা অনেক বেশি ক্লোজ। এই জন্য যে নাচ তো ১০০ ভাগ পারফরমিং আর্ট। এ জন্য স্টুডেন্টদের সারাক্ষণ ডিপার্টমেন্টে থাকতে হয়। ওরা নয়টায় আসে, বিকাল পাঁচটা-ছয়টা পর্যন্ত থাকে। ক্লাস, রিহার্সাল, নানা অনুষ্ঠান। সবকিছু মিলে স্টুডেন্ট এবং টিচারদের মধ্যে ইন্টার-অ্যাকশনটা অনেক বেটার। সেটা আমি উপভোগ করি।
আনিসুজ্জামান : এখন একদিকে সুরের ধারা আরেক দিকে নৃত্যকলা বিভাগ। আর কী পরিকল্পনা আছে ভবিষ্যতে ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : পরিকল্পনা তো ‘সুরের ধারা’কে আরেকটু বড় করা। নৃত্যকলা বিভাগটাকে আরেকটু গুছিয়ে নেওয়া। কারণ আমি ফিল করি যে নৃত্যকলা বিভাগের জন্য টোটালি আলাদা জায়গা প্রয়োজন। পুরো জিনিসটা আলাদা দরকার। কারণ যারা নাচ করবে তাদের তো ক্লাসের জন্য যে ধরনের রুম লাগে সেটা স্পেশালাইজড রুম। তারপরে অনুশীলন এবং মহড়ার জন্য লাগে স্পেশালাইজড রুম। সাউন্ড প্রুফ, কাঠের ফ্লোর, মিরর থাকতে হয় চারদিকে। অনেক রকম ব্যাপার আছে। অন্য বিষয়ের ক্ষেত্রে যেমন হয় যে রুম ৪০২ খালি আছে, গিয়ে ক্লাস করো। এখানে সেটা হবে না। একদম আলাদা। আমাদের ও রকম একটা ডান্স ফ্লোর আছে। এ রকম অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টা ডান্স ফ্লোর দরকার, পুরো ডিপার্টমেন্টের জন্য। সেগুলো তৈরি করা একটা চ্যালেঞ্জের ব্যাপার।
আর ‘সুরের ধারা’টাকে আমি ফিল করি যে নিজস্ব জায়গা থাকলে আরও অনেক ভালো করতে পারতাম। বিশেষ করে ফিল করি এমএফডি প্রজেক্টের বাচ্চাদের নিয়ে। ওরা আমাদের এখানে তিন দিন আসে। হয়তো ওদের সারাক্ষণ কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে, ওদের হোমওয়ার্ক করানো হচ্ছে, গান শেখানো হচ্ছে, নাচ শেখানো হচ্ছে। কিন্তু তিন দিন পরে বাকি চার দিন যখন ওরা বাড়িতে থাকে, ওই সময় ওখানকার পরিবেশ ওদেরকে শুধু টেনে নামায়। যেমন আমরা সারাক্ষণ বলছি—মিথ্যা কথা বোলো না। ড্রাগস থেকে দূরে থাকো। চুরি-টুরি এসব কোরো না। এগুলো তো সারাক্ষণ কাউন্সিলিং করছি। কিন্তু বস্তির পরিবেশ একেবারেই ভিন্ন। ওরা কেউ যদি নাও চায় তবু ওদের জোর করে ওইটার মধ্যে ঢোকাবার চেষ্টা করে। আমাদের যদি নিজস্ব জায়গা থাকত, তাহলে এই ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে আমরা নিয়ে আসতাম, মানে এসএসসি পাস করিয়ে তারপরে ওদের ছাড়তাম। কারণ আমাদের মনিটরিং থাকলে ওই বাচ্চাগুলো আর নষ্ট হওয়ার সুযোগ পেত না।
আনিসুজ্জামান : পৃথিবীর যেখানে বাঙালি জনগোষ্ঠী আছে, সেখান থেকেই রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার ডাক আসে। বন্যা এটা কী করে সামলায় ? সারা বছরই বাইরে যেতে হয় ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : যাই। কিন্তু আমার যাওয়া-আসাই সার হয়। অনুষ্ঠানের আগের দিন পৌঁছালাম, অনুষ্ঠান করলাম, পরের দিন চলে এলাম। এর মাঝে নিজের জন্য কিছু সময় কাটানো বা বেড়ানো, সেটা হয় না। আমি যেটা করি, সাধারণত প্রেফার করি, বিশেষ করে নতুন জায়গায় যেখানে অনুষ্ঠান করতে যাই—হোটেলে না থেকে কারও বাড়িতে থাকি। তাতে কী হয়—ওখানকার মানুষদের সাথে ওঠাবসা-জানাশোনা হয়। কারণ বাড়িতে একটা অন্য পরিবেশ থাকে—তাদের খাওয়া-দাওয়া, তাদের আচার-ব্যবহার অন্যরকম ব্যাপার। ওটার মধ্য দিয়ে অনেক রকমের মানুষের সাথে পরিচয় হয়। গান করতে বিদেশ যাওয়ার ফলে যেটা হয়, সত্যিকারের প্রাপ্তি ঘটে—অনেক রকম লোকের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচয় হয়। তাদের কিছু পুরোনো বিষয়, কিছু চিন্তাভাবনা—সবকিছুর সাথে আমার পরিচয় হয়। এটা আমি উপভোগ করি। আসলে জীবনের অভিজ্ঞতা নানারকমের। বন্ধুত্ব হয় অনেক রকমের। যারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। তবে আমার সৌভাগ্য বলতে হবে যে আমি কোনোরকম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ি নি। সে জন্য আমার কোনো আফসোস হয় না, ভাবি না—কেন বাড়িতে থাকতে গেলাম, হোটেলে থাকলাম না!
আনিসুজ্জামান : বন্যা আরেকটি কাজ করে। বিদেশে যখন যায় তখন বিদেশি শ্রোতাদের জন্য—যারা বাংলা জানে না—তাদের জন্য গানের কথা ইংরেজিতে বলে। রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করে বাংলায়, কিন্তু এর ধারাভাষ্যটা করে ইংরেজিতে। আমি এটা দেখেছিলাম ২০০৫ সালে টরন্টোতে। আমার সঙ্গে ছিলেন অক্সফোর্ডের নামকরা অধ্যাপক তপন রায়চৌধুরী। উনি আমাকে বললেন, বন্যার এই অনুষ্ঠান দেখতে আমি পৃথিবীর যে-কোনো জায়গায় যেতে প্রস্তুত। আমি মনে করি বন্যার জন্য এটা খুব বড় একটা কমপ্লিমেন্ট ছিল। মাথায় কীভাবে এল এই আইডিয়াটা ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : মানুষ আসলে প্রতিনিয়ত শেখে নানান অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। একবার নিউইয়র্কে আমার একটা গানের শুটিং হচ্ছে। তারেক মাহবুব, আপনি চেনেন কি না জানি না—তারেক মাহবুব একবার বলেছিলেন, আপা আপনার কিছু গান ভিডিও করে রাখব। আমি বলেছিলাম, ঠিক আছে। তো নিউইয়র্ক শহরের নানা জায়গায় সেই ভিডিও’র শুটিং হচ্ছে। সব জায়গায় হয়তো পথচারী যারা দেখে, দাঁড়িয়ে একটু দেখে আবার চলে যায়। এখানে তা হলো না। ওখানে ব্যাটারি পার্ক বলে একটা জায়গা আছে, সেই পার্কে সান্ধ্য ভ্রমণকারীরা হাঁটছে কুকুর নিয়ে, জগিং করছে। তো শুটিং করছি, এক মাঝবয়সী মহিলা পুরোটা সময় পাশে দাঁড়িয়ে শুটিং দেখল। শুটিং যখন শেষ হলো, আমি সাইডে দাঁড়িয়ে পানি খাচ্ছি, ভদ্রমহিলা আস্তে আস্তে আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘ওয়াজ দ্যাট অ্যা স্যাড সং, বিকজ আই ফেল্ট লাইক ক্রায়িং।’ অথচ আমি যখন গেয়েছি আমার মাথায় আসে নি। আমি লিপসিং করেছি। গানটা ছিল ‘আমার সকল দুখের প্রদীপ জ্বেলে দিবস গেলে করব নিবেদন’। তখন আমার মনে হলো যে এটা তো দুঃখেরই গান। কিন্তু গাইবার সময় আমি কখনো ফিল করি নি, সুরটা দিয়ে গেয়ে গেছি। একজন বিদেশি মহিলা, ভাষা বোঝে না, কিছু বোঝে না, কিন্তু সে সুরটাতেই বুঝতে পেরেছে এটার মধ্যে একটা প্যাথোজ আছে। একটা স্যাডনেস আছে। তখন আমার মনে হলো যে, ভাষাটা যদি বুঝত তাহলে আরও তাড়াতাড়ি রিলেট করতে পারত। এটা ভেবে তখন আমার মাথায় এল যে যখন বিদেশে—বিদেশিদের জন্য গান করি—তখন উচিত হচ্ছে যে ওটাকে একটু ইংরেজিতে বোঝানো, যাতে ওরা কথাটা বুঝতে পারে। তখন সুরটা কানে এলে রিলেট করতে পারবে। এটা খুব সফল হয়েছে। কিছুদিন আগে নিউইয়র্কে একটা অনুষ্ঠান ছিল—ম্যানহ্যাটনে ইন্টারন্যাশনাল মিউজিক ফেস্টিভ্যাল—ওখানে সারা পৃথিবীর মিউজিককে প্রমোট করা হয়। ওরা বাংলাদেশ থেকে আমাকে বলেছিল গান করতে। আমি ওখানে এভাবেই করলাম। ওখানে সব বিদেশি অডিয়েন্স, ইন্টারন্যাশনাল মিউজিক প্রফেশন সেন্টার এটা, যারা মেম্বার ওই ক্লাবের। প্রত্যেককে জানানো হয়েছিল এই অনুষ্ঠানের কথা। ওরা তখন এসেছিল। সব বিদেশি। গীতাঞ্জলির ওপর অনুষ্ঠানটা করেছিলাম মেইনলি। পরে অনেকে এসে আমাকে বারবার জিজ্ঞেস করেছে যে রবীন্দ্রনাথের আর কী কী বই আছে ? তাঁর বই কোথায় পাওয়া যেতে পারে ? আমি বললাম, দেখো রবীন্দ্রনাথের অনেক অনুবাদ আছে, অনেক বই আছে, তোমরা একটু খোঁজ করে দেখো। গুগলে সার্চ দিলেই পেয়ে যাবে কী কী বই আছে। তাতে মনে হলো রবীন্দ্রনাথের প্রতি এই যে আগ্রহটা তৈরি করা গেল বিদেশিদের মধ্যে, এটাও একটা কম পাওয়া না।
আনিসুজ্জামান : তোর সিডি কত, সংখ্যায় ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : ঠিক হিসাব নেই। তবে কয়েকদিন আগে আমি একটা অনুষ্ঠান করলাম। অনুষ্ঠানের আগে আমার যে পরিচিতি দিল, সেটার মধ্যে শুনলাম বলল—১৬৫ না ১৭৫টা সিডি বোধহয়।
আনিসুজ্জামান : এই সিডিগুলো সারা দুনিয়ায় ঘুরছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনেক সম্মান জানানো হয়েছে বন্যাকে। আমরা তার কয়েকটা শুনি—কী কী ?
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা : প্রথমটার কথা খুব মনে আছে। প্রথমটা হচ্ছে যায়যায়দিনের একটা পুরস্কার। তখন মনে আছে, আব্বা নিয়ে গিয়েছিল আমাকে। ওরা তো খুলে বলে নি। খালি বারবার বলছে, আপনি প্লিজ আসবেন। তখন তো আমার অভিজ্ঞতাও নেই। বারবার ‘প্লিজ আসবেন প্লিজ আসবেন’ বলেছে। তা আমি ভেবেছি যে নেমন্তন্ন করেছে। আমার যাওয়াটা ওদের জন্য প্রয়োজন সেটা বুঝতে পারি নি। আমি আর আব্বা বসে আছি। দেখছি যে নানাজনকে ডাকছে, একে পুরস্কার দিচ্ছে ওকে পুরস্কার দিচ্ছে, আমি তো আর বুঝি নি। তারপরে যখন আমার নাম ডাকল, তখন খুব একটা অন্যরকম অনুভূতি হলো। ওটা আমার প্রথম পুরস্কার আর অজানা ছিল একেবারে—চিন্তাতেই ছিল না, কল্পনাতেই ছিল না। যায়যায়দিনের পুরস্কারটা অনেকদিন আগে পেয়েছিলাম, ১৯৮৭ সালে। তারপরে আনন্দ সংগীত পুরস্কার পেলাম। ওটাও আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে ফোন করে বলেছে, আপনাকে আসতে হবে অনুষ্ঠানে। তখন আব্বার বাইপাস অপারেশন হচ্ছে। সে কারণে আমি তখন কলকাতায় ছিলাম আব্বার সাথে। আমি বললাম, কী ব্যাপার ? ওরা বলছে—না দিদি প্লিজ আসতে হবে, আসতে হবে। কার্ড পাঠিয়ে দিয়েছে। ওটা অবশ্য আমি জানতাম। কারণ এইচএমভি থেকে আমাকে বলেছিল যে আমরা তিনটা সিডি পাঠিয়েছি। তার মধ্যে একটা আপনার। ওইটাই নমিনেশন পেয়েছে। আনন্দ সংগীত পুরস্কার পরপর দু’বার পেলাম। আর বাংলা একাডেমিতে ২০১৪ সালে পুরস্কার পেলাম, ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার পেলাম। আর এমনিতে ঋষিজ পুরস্কার, আর ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সংগীত সম্মাননা পেলাম। এবার বঙ্গভূষণ পুরস্কার পেলাম।
আনিসুজ্জামান : দেখা যাচ্ছে যে, বন্যা যেমন সকলকে তার সংগীতের মাধুর্য দিয়েছে, তার শ্রোতারাও বন্যাকে কিছু দিয়েছে সম্মাননা। আমরা আজ এখানেই শেষ করব। বন্যার সংগীতজীবন আরও পূর্ণতায় পরিণত হোক আগামী দিনগুলোয়—এই প্রত্যাশা আমরা রাখি। বন্যা আমাদের মধ্যে থেকে অনেক দিন রবীন্দ্রসংগীতের চর্চাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলুক।
Leave a Reply
Your identity will not be published.