পান্তাপ্রীতি

পান্তাপ্রীতি

রবীন্দ্রনাথের “দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া...ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া...” এই কবিতাংশের ভাব সম্প্রসারণ করতে গিয়ে এক অলীক কারণে হিটলু হিমশিম খেতো।

হিটলু আমার কাজিন। আমার চেয়ে চার ক্লাস নিচের ছাত্র। কাজেই তার ওপর আমার পণ্ডিতি জাহির করার একটা অলিখিত অধিকার ছিল। আমি ছাত্র হিসেবে খুব বেশি ভালো না হলেও আমার নিয়মানুবর্তিতা মামার কাছে মানে হিটলুর বাবার কাছে খুব দাম পেত।

“পড়া ফাঁকি দিলে চামড়া আর মাংস আলাদা করে আমাকে খবর দিস রিপন। আমি দুলহা চামারকে ডেকে সস্তা দামে ওর চামড়া বিক্রি করব—” মামার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। তবুও হিটলুকে পড়ার প্রতি মনোযোগ দিতে দেখি নি।

তার যত ঝোঁক তা পান্তার প্রতি। শীত বা গরম, রাত বা সকাল তার পান্তা চাই-ই চাই। কাজেই বয়সে বা সাইজে বড় হলেও সমাজ যাকে বড় বলে সেরকম বড় সে হতে পারে নি। সেভেন পর্যন্ত পড়ে সে ইস্তফা দেয়। বহুদিন পর বাড়ি গিয়ে জানতে পারি, সে ভাতের হোটেল দিয়েছে। সেই হোটেলের প্রধান আইটেম পান্তাভাত আর আলুভাজি।

এই ঈদে বাড়ি গিয়ে তার দোকানে যাই আমি। সে খুব ধীরে এসে আমার গা ঘেঁষে বসে।

“ভাইয়া জানো, আমার মনে হয় তোমার ওই দাড়িওয়ালা লোকের কবিতায় ছাপার ভুল ছিল।”

“মানে ?”

“আমার মনে হয় ‘ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া’ হবে না। তিনি লিখেছিলেন, “ঘর হতে শুধু দুই প্লেট পান্তা ফেলিয়া...”

“তুই আসলেই একটা গবেট। তোর মাথায় পান্তা ছাড়া আর কিছু আসে না ?”

“আসে ভাইয়া। খুব আসে। তোমার মতো যদি বিদেশ দেখতে পারতাম!”

তার আক্ষেপ আমাকে দহন করে।

পৃথিবীতে কত লোকের স্বপ্নই তো পূরণ হয়, হিটলুর এই সামান্য চাওয়া পূরণ হতে দোষ কী ?

খুব সাহস করে তাকে শ্রীলঙ্কা সফরে নিয়ে এসেছি।

পাসপোর্ট তার ছিলই। ছোট ছেলের কিডনির অপারেশন করার জন্য তাকে ইন্ডিয়া যেতে হয়েছিল। কাজেই পাসপোর্ট করার ঝক্কি আর নেই। টিকিট কেটেই চেপে বসলাম আকাশযানে।

ইউটিউবে ব্লগ দেখে যা তথ্য পেয়েছিলাম তাতে পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ ইমিগ্রেশন চেকিং হয় শ্রীলঙ্কায়।

হয়তো ঠিকই। কিন্তু আমাদের জন্য তা একটু বিব্রতকর ছিল। ইমিগ্রেশনে একাধিক বুথে অফিসাররা পাসপোর্ট-ভিসা, কেন এসেছি, হোটেলের নাম-ঠিকানা জিজ্ঞেস করছেন। সকল কথাবার্তা ইংরেজিতে হচ্ছে। দুর্ভাগ্যক্রমে আমি আর হিটলু দুই বুথে পড়ে গেলাম। আমার সকল পেপার দেখিয়ে পার হয়ে গিয়ে দেখি হিটলুর মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। সে দরদর করে ঘামছে। তার মুখ দিয়ে কিছু কথাই বের হচ্ছে না। আমি দূর থেকে দেখছি।

একবার ভাবুন। কলম্বো বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে আছে হিটলু। জীবনে প্রথম বিদেশ ভ্রমণ। আত্মবিশ্বাস আকাশচুম্বী। কারণ তার দৃঢ় বিশ্বাস—“পৃথিবীর সব মানুষই একটু-আধটু বাংলা জানে।”

অবশেষে তার পালা এল।

ইমিগ্রেশন অফিসার পাসপোর্ট হাতে নিয়ে মুচকি হেসে বললেন, “পরিদর্শনের উদ্দেশ্য ?”

হিটলু অফিসারের দিকে তাকিয়ে রইল।

অফিসার আবার বললেন, “পর্যটন ? ব্যবসা ?”

হিটলু এবারও নির্বিকার। মনে মনে ভাবছে, “লোকটা বাংলা ঠিকমতো বলতে পারতেছে না, তাই বুঝতে পারতেছি না।”

অফিসার এবার জিজ্ঞেস করলেন, “কোন হোটেল ?”

হিটলু হাসিমুখে উত্তর দিল, “জি।”

অফিসার অবাক।

“হোটেলের নাম ?”

হিটলু আবারও বলল, “জি, ঠিক আছে।”

অফিসার পাশের নারী সহকর্মীকে ডাকলেন।

দ্বিতীয় নারী অফিসার এসে বললেন, “তুমি কোথায় থাকবে ?”

হিটলু এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “বাংলায় বলেন না কেন ? আমি তো এতক্ষণ ধরে আপনার কথাই শুনতেছি!”

দুই অফিসার একে অপরের মুখের দিকে তাকালেন।

এরপর হিটলু ব্যাগ থেকে হোটেল বুকিং বের করতে গিয়ে আরও বিপদে পড়ল। বুকিংয়ের কাগজ সে এমন নিরাপদ জায়গায় রেখেছে যে নিজেই খুঁজে পাচ্ছে না।

ব্যাগের ভেতর থেকে বের হলো—

এক প্যাকেট চানাচুর,

দুইটা গামছা

তিনটা চার্জার

চারটা বিস্কুট

পাঁচটা পান

কিন্তু হোটেলের কাগজ নেই! ইমিগ্রেশন অফিসারদের মুখে উদ্বেগ। হিটলুর মুখে আত্মবিশ্বাস। অবশেষে অনেক খোঁজাখুঁজির পর কাগজটা পাওয়া গেল।

নারী অফিসার কাগজ দেখে বললেন, “আহ, হাবরানা!”

হিটলু সঙ্গে সঙ্গে খুশি হয়ে উঠল।

“এই তো! আগে যদি বাংলায় হাবারানা বলতেন, তাহলে এতক্ষণে কাজ শেষ হয়ে যেত!”

অফিসার কিছু না বুঝে মাথা নেড়ে পাসপোর্টে সিল মেরে দিলেন।

বেরিয়ে আসতে আসতে হিটলু ফোন করে দেশে খবর দিল, “বিদেশের মানুষজন খুব ভালো। তবে ইংরেজি সামান্য কম জানে, তাই কথা বলতে কষ্ট হয়। তবে শেষে আমার বাংলা বুঝে গেছে!”

পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমি আগেই হাজির হয়েছি।

“কী হলো তোর ? যা জিজ্ঞাসা করছে তা বলে বের হয়ে আসতে পারতিস!”

“তুমিও মজা নিচ্ছ ভাইয়া ? এই লোক তো বাংলা জানে না। কে একে আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে চাকরি দিয়েছে বলো তো ? আমি হোটেলের নাম দিয়েছি। তারপরও সে ফাঁপর নিচ্ছে কিসের জন্যি!”

আমি ত্রাতা সেই ইমিগ্রেশন অফিসার ভদ্রমহিলাকে ধন্যবাদ দিই।

হিটলু এবার সেই মহিলার ওপর খুব খুশি হয়।

“বুঝছো ভাইয়া, বেটি মানুষের মন পান্তা ভাতের মতো ঠান্ডা আর নরম।”

উফ, আবার পান্তা!

আমরা যে হোটেলে উঠেছি, সেখানে বুফে ব্রেকফাস্ট দেওয়া হয়। হিটলু সকল কাউন্টার তন্নতন্ন করে খুঁজেও তার প্রিয় পান্তা আর পায় না।

সে শুধু ডিম আর জুস খেয়েই প্রথম দিন কাটিয়ে দিয়েছে। আমি খুব চিন্তা করে বের করলাম, হিটলুর কলম্বো সফরের সবচেয়ে বড় বিপদ কিন্তু ইমিগ্রেশনে হয় নি। হয়েছে খাওয়াদাওয়ার বেলায়।

কলম্বোর নামি-দামি হোটেলে উঠেছে সে। সকালে বুফে ব্রেকফাস্টে টেবিলভর্তি খাবার—সসেজ, বেকন, নুডলস, ক্রসাঁ, ফলমূল, জুস, কফি—কী নেই! পরের দিন সকাল। সূর্য ঠিকই হেসেছে।

কিন্তু হিটলুর মুখ ভার।

ওয়েটার ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করল, “স্যার, কিছু সমস্যা ?”

হিটলু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “পান্তা ভাত নাই ?”

ওয়েটার ভাবল, হয়তো কোনো আন্তর্জাতিক খাবারের নাম। কিচেনে গিয়ে শেফকে জিজ্ঞেস করল। শেফ আবার গুগলে খুঁজল। কিন্তু হিটলুর মন ভরানোর মতো কিছুই মিলল না।

তিন দিন কেটে গেল।

হিটলু শুধু বিস্কুট আর কলা খেয়ে বেঁচে আছে। তার চোখের নিচে কালি পড়েছে। বন্ধুদের বলছে, “বিদেশ ভালো, কিন্তু পান্তা ছাড়া জীবন অর্থহীন।”

চতুর্থ দিনের রাতে হঠাৎ তার মাথায় এক যুগান্তকারী বুদ্ধি এল।

রুম সার্ভিস থেকে একটা ঠান্ডা পানির বোতল আনাল। তারপর গোপনে ব্যাগ থেকে বের করল দুপুরের বেঁচে যাওয়া সাদা ভাত আর বাংলাদেশ থেকে আনা এক শিশি লবণ। সাবধানে বোতলের অর্ধেক খালি করে তার মধ্যে ভাত ঢালল। তারপর এক চিমটি লবণ। এরপর বোতলটা ভালো করে ঝাঁকাল। ভাতগুলো নেচে উঠল এবার।

হিটলুর চোখে তখন বিজয়ের ঝিলিক। পরের দিন সকালে উঠেই দেখি তার হাতে সেই ভাতের বোতল।

এক চুমুক খেয়েই সে আবেগে বলে উঠল, “আহ! এটাই তো জীবন!”

পান্তা ভাত নিয়ে গ্রাম-বাংলায় একটি পুরোনো কৌতুকের ছড়া বেশ প্রচলিত। এক অলস স্ত্রী তার স্বামীকে বোকা বানাতে নিজে গরম ভাত খেয়ে স্বামীকে পান্তা ভাত খাওয়াত। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে সে তখন একটি মজার ছড়া কাটত, “পান্তা ভাতের জল, তিন পুরুষের বল; আমি অভাগী গরম খাই, পান্তা ভাতে সুখ নাই!”

হিটলুর পরের বয়ান নেওয়ার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। যে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে তার ছাত্রজীবনে এত ভীতি ছিল, পান্তার ব্যবসা করতে এসে এবার সেই রবীন্দ্রনাথের কথাগুলোই সে আমাকে শোনায়।

“জানো ভাইয়া, পান্তা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কথা আমার খুব মনে ধরেছে।”

গুরুদেব সেই ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে লিখে গেছেন, ‘বাংলার জল হইতে জেলে, মদ হইতে মোদো, পানি হইতে পানতা, নুন হইতে নোনতা...।’ সংস্কৃত. পানীয় পানি পানি তা > পানিতা > পানতা। পানতা ভাত হলো ভাত সংরক্ষণের একটি পদ্ধতি। রান্না করা ভাতকে পানিতে এক রাত ডুবিয়ে রাখলে তা পানতা ভাতে পরিণত হয়। উঁচু কানা যুক্ত যে থালায় পানতা ভাত খাওয়া হয় তাকে বলে ‘পানতি’। গ্রাম-বাংলায় এখনো পানতি-তে পানতা ভাত খাওয়ার প্রথা প্রচলিত আছে। ‘পানতি’ দেশি শব্দ।

পৃথিবীর সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য একদিকে, আর ক্ষুধার্ত বাঙালির সামনে এক বাটি পান্তা অন্যদিকে।

পরদিন সকালে হোটেলের কর্মচারীরা অবাক হয়ে দেখল, চার দিন পর হিটলু হাসিমুখে নাশতা করছে।

একজন জিজ্ঞেস করল, “স্যার, আজ এত খুশি কেন ?”

হিটলু গর্বভরে উত্তর দিল, “তোমাদের দেশে পান্তা না থাকলেও সমস্যা নাই। বাঙালি চাইলে বিজ্ঞান দিয়ে সব পারে!”

বহু বছর পরও সেই হোটেলের কর্মচারীরা নতুন স্টাফদের একটা গল্প শোনাবে—“একজন বাংলাদেশি অতিথি এসেছিল। ইংরেজি জানত না, কিন্তু বোতল-পান্তা বানিয়ে খেয়েছিল!”

আর হিটলু দেশে ফিরে সবাইকে একটাই উপদেশ দেবে—

“বিদেশে যাওয়ার আগে ইংরেজি না শিখলেও চলবে, কিন্তু পান্তা বানানোর কৌশল শিখে যেয়ো। কারণ পাসপোর্ট ছাড়া মানুষ একদিন চলতে পারে, পান্তা ছাড়া বাঙালি একদিনও না!”

কলম্বো সফর শেষে হিটলু উপলব্ধি করল—মানুষ দেশ ছাড়তে পারে, গ্রাম ছাড়তে পারে, এমনকি ভাষাও ভুলে যেতে পারে; কিন্তু পান্তাভাতের প্রতি বাঙালির প্রেম চিরকালীন, আন্তর্জাতিক।

 

 

 

Leave a Reply

Your identity will not be published.