‘যার ছায়া পড়েছে মনের আয়নাতে’, ‘মনে যে লাগে এত রং’, ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই’, ‘আমি সাগরের নীল’... ইত্যাদি গানগুলো এখনো আমাদের মুগ্ধ করে। নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত করে মনের নিকুঞ্জ। আমরা অলস বিকেল আর নিঝুম রাতে এমন গানের সুর শুনে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে কান পেতে রই। এই জীবন্ত কিংবদন্তি শিল্পীর নাম ফেরদৌসী রহমান। এমন বিমুগ্ধ চিত্তে আব্বাসউদ্দীনের গানও শুনতেন সংগীতপ্রিয় বাংলা ভাষাভাষী সমগ্র বিশ্বের মানুষ। ফেরদৌসী হচ্ছেন পল্লিগীতি সম্রাট ও শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের যোগ্য উত্তরসূরি। পিতার কাছেই তাঁর প্রথম সংগীতে হাতেখড়ি। পরে অনেক নামি-দামি শিল্পীর কাছেই তিনি গান শিখেছেন। তাঁদের মধ্যে ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, ইউসুফ খান কোরেইশী, কাদের জামেরী, গুল মোহাম্মদ খান প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তাঁর জন্মস্থান কুচবিহারের অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক পরিবেশও তাঁর শিল্পীজীবনে চমৎকার প্রভাব ফেলেছে। ফেরদৌসী রহমান বাংলাদেশ টেলিভিশনের উদ্বোধনী দিনের প্রথম সংগীতশিল্পী। গান নিয়েই তাঁর সারাজীবনের স্বপ্ন ও ভাবনা পরিপূর্ণতা লাভ করেছে সফলতার মালা-প্রাপ্তির মাধ্যমে। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, আধুনিক ও পল্লীসংগীত, সব ধরনের গানেই তাঁর অনায়াস দক্ষতা।
পাঁচ দশক ধরে গানের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা। ১৯৬০ সালে ‘আসিয়া’ ছবিতে প্রথম প্লেব্যাক করেন। এরপর ষাট ও সত্তর দশকে বহু চলচ্চিত্রের নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে যুক্ত ছিলেন। প্লেব্যাক করা চলচ্চিত্রের সংখ্যা ২৫০টির মতো প্রায়। ১৯৬০ সালে ইউনেস্কো ফেলোশিপ পেয়ে লন্ডনে ট্রিনিটি কলেজ অব মিউজিক থেকে সংগীতে ছয় মাসের স্টাফ নোটেশন কোর্স সম্পন্ন করেন। ৩টি লং প্লে রেকর্ডসহ প্রায় ৫০০টি ডিস্ক রেকর্ড এবং দেড় ডজনের বেশি গানের ক্যাসেট বের হয়েছে। এ পর্যন্ত তাঁর রেকর্ডকৃত গানের সংখ্যা পাঁচ হাজার প্রায়। তিনিই এ দেশের প্রথম মহিলা সংগীত পরিচালক। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে তিনি অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার এবং মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা পুরস্কার অন্যতম।
সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ফেরদৌসী রহমানের আত্মজীবনী ‘লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা’। এই গ্রন্থটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয় গতকাল, ৭ জুলাই, বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে। সেখানে ফেরদৌসী রহমান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন তাঁর সহশিল্পী আরেক কিংবদন্তি শিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী, কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপাসহ অনেকে। নিজের আত্মজীবনী সম্পর্কে ফেরদৌসী রহমান বলেন, “নিজে বিশেষ কোনো কাজ করতে পেরেছি বলে মনে হয় না। তবে বইটিতে অনেক মানুষের কথা আছে। অনেক বিষয় আছে। বিশেষ করে পুরোনো দিনের ঢাকা কেমন ছিল, তখনকার পরিবেশ, অনেক খাদ্য, পুরোনো দিনের ঢাকার কোথায় কী হতো, যা এখন আর হয় না, বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া অনেক আচার-অনুষ্ঠানÑএসব আছে। বইটি পড়লে সেসব জানা যাবে।”
এই আত্মজীবনীতে পুরোনো ঢাকার নানা কথা ছাড়াও রয়েছে ফেরদৌসী রহমানের পরিবার, উপমহাদেশের গুণী সংগীতজ্ঞসহ নানা প্রসঙ্গ। বলা যায়, ফেরদৌসী নিজে যেমন দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন, তেমনি এই বইটিও দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হয়ে উঠেছে।
প্রথমা প্রকাশন আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠিকতা শুরু হয়েছিল ফেরদৌসী রহমানের দুটি গান ‘লোকে বলে প্রেম’ ও ‘আমি সাগরের নীল’ পরিবেশনা দিয়ে। গান দুটি গেয়ে শোনান শিল্পী অনুপমা মুক্তি। গিটারে ছিলেন শাকিল মোহাম্মদ দীপন। সঞ্চালক মেরিনা ইয়াসমিন শিল্পী ফেরদৌসী রহমানের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরেন। বইটি প্রকাশনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলেন গীতিকবি কবির বকুল।
উল্লেখ্য, লেখালেখিতেও ফেরদৌসী রহমানের আগ্রহ রয়েছে। সংগীত-বিষয়ক তাঁর বহু লেখা বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। ‘গান গেয়ে এলাম চীনে’ তাঁর লেখা প্রথম গ্রন্থ। ‘পালা গানে আমাদের সমাজব্যবস্থা’ শীর্ষক আরও একটি গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। এছাড়া ২০১১ সালে অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম সম্পাদিত ‘বাংলার গানের পাখি ফেরদৌসী রহমান’। এখানে ফেরদৌসী রহমানকে নিয়ে নানাজনের স্মৃতিকথা ঠাঁই পেয়েছে।
প্রকাশনার আলোয় ‘লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা’
অন্যদিন ০৮ জুলাই ২০২৬ ০ টি মন্তব্য
Related Articles
মনে পড়েছিল
ইমদাদুল হক মিলন১৬ জুলাই ২০০৩বাবাকে আটকে রেখেছে শুনে মা খুবই দিশেহারা হলেন। বোনগুলোর মুখ শুকিয়ে গেল। বড়ভাই মুখ গোঁজ করে বসে রইলেন আর আমি পাগলের মতো ছুটে বেরিয়ে গেলাম। আমার বড়ভাইটি বাবাকে তেমন পছন্দ করত না।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় মিতিয়া ওসমান তিসমা
অন্যদিন১৫ অক্টোবর ২০২১জার্মান সরকারের আমন্ত্রণে পৃথিবীর বৃহত্তর ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় দ্বিতীয়বারের মতো অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করছেন ময়ূরপঙ্খির প্রকাশক এবং আগামী প্রকাশনীর নির্বাহী পরিচালক মিতিয়া ওসমান তিসমা।
নিরুদ্দেশ: রাসেল রায়হান
রাসেল রায়হান২৫ জুন ২০২৩কানে শোনে না জানি, তবু অভ্যাসবশত ডাক দিই আমি (ডাক্তারও বলেছে সব সময় কথা বলতে), লহরি, ওদিকে যায় না। সামনে মাল্টিপ্লাগে ইলেকট্রিসিটি আছে। লহরি। আমি জানি, এখনই এক ঝটকায় ওকে সরিয়ে দেওয়া উচিত। তবু দিতে পারি না।
নারীর ক্ষমতা ও সমতাঃ নারীবান্ধব রবীন্দ্রবলয়ে স্ববিরোধিতা
পূরবী বসু০৮ মার্চ ২০২১সময়ের বিচার করলে দেখা যাবে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ অর্ধাংশে এই উপমহাদেশকে আলোকিত করে একসঙ্গে আবির্ভূত হয়েছিলেন অনেকগুলো ক্ষণজন্মা মানুষ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে।
Leave a Reply
Your identity will not be published.