৫০ বছরে ‘সূর্যকন্যা’

৫০ বছরে ‘সূর্যকন্যা’

১৯৭৬ সালে মুক্তি পেয়েছিল ‘সূর্যকন্যা’। আলমগীর কবির পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের এই চলচ্চিত্রের ৫০ বছর পূর্তি হলো সম্প্রতি। এই চলচ্চিত্রটির ওপর আলো ফেলা হলো এখানে।

প্রথমেই উল্লেখ করা দরকার যে, ‘সূর্যকন্যা’-য় চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির ‘সময়’ উপাদানটি ব্যবহার করেছেন Free element-র মতো। দৃশ্য উপস্থাপনা গতি, ছেদ, শট কম্পোজিশন ও প্রযুক্তিতে ‘সূর্যকন্যা’ ছবিতে একজন আধুনিক চলচ্চিত্রকারের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।

ছবির নায়ক লেনিন—একজন সংবেদনশীল, স্বপ্ন ও বাস্তবের ঘোর লাগা শিল্পীপুরুষ। তাই তো আমরা লক্ষ করি, অসহায় পথচারীর ওপর ছিনতাইকারীর হামলা দেখে লেলিন কল্পনায় প্রতিবাদী হয়; শূন্য স্টেডিয়ামে বায়বীয় বলে ব্যাট চালিয়ে বহু চার-ছক্কা মারে;  সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তৎকালীন ‘ইন্দিরা মঞ্চ’-এ টোকাইদের সামনে হাত-পা ছুড়ে নেতাদের মতো বক্তৃতা দেয়। বলা যায়, স্থান ও সময় লেলিনের কাছে কখনো থমকে দাঁড়ায়। আগে পিছে হয়। আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে সে এক মানস প্রতিমা তৈরি করে—যার বসবাস তাঁর অবচেতন মনে। একদিন বন্ধু রাসেলের দোকানের ডিসপ্লের ম্যানেকিন মূর্তিটি জীবন্ত হয়ে লেলিনের সেই মানস প্রতিমার রূপ নিয়ে হাজির হয়। এই নারী শিল্পীর চিরন্তন—সৌন্দর্যসুষমা; অর্ধেক কল্পনা অর্ধেক বাস্তবের পুরুষমনের চিরন্তন প্রেয়সী—কখনো লাবণ্য, কখনো ইউরিডিস, কখনো তানিয়া, কখনো ভেনাস। এত রূপ, এত গল্প! রবীন্দ্রনাথের কাছে সে ছিল দূরে-বহুদূরে-স্বপ্নলোকে উজ্জয়িনীপুরের প্রথম জনমের প্রথম প্রিয়া, আলমগীর কবিরের কাছে সে যেন ছেলেবেলার টিনের ছাদে কুল গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া শিশিরের টিপটিপ শব্দ কিংবা শৈশব স্মৃতির সেই মন সুদূরে টানা স্টিমারের বাঁশির নস্টালজিক হাতছানি।

হ্যাঁ, লেনিন রোমান্টিক। যা হোক, একদিন স্বপ্নলোকের মানবীকে জিজ্ঞেস করে লেনিন, ‘তুমি কে ?’ উত্তরে মানবী বলে নারীর বন্দিনী হওয়ার ইতিহাস। একসময় ভোর হওয়ার আভাস পাওয়া যায়। অন্ধকার কেটে আলো ফোটে। কিন্তু সেই সূর্যের আলো দেখার অধিকার নেই মানবীর—লেনিনকে জানায় সে। বলাই বাহুল্য, এটিও প্রতীকী। কেননা এখন আর অসূর্যস্পর্শার যুগ নেই। আবার এটিও কি সত্যি নয় যে, নারীরা কি আজও আঁধারে বন্দিনী ? তাই তো এক পর্যায়ে সেই রমণী গেয়ে ওঠে গান : ‘আমি যে আঁধার বন্দিনী আমারে আলোতে ডেকে নাও.../ স্বপন ও ছায়াতে চঞ্চলা, আমারে পৃথিবী কাছে নাও।’ মানবী সেই গানের মাঝে আকুল হয়ে লেনিনের প্রেম ভিক্ষা করে।

কিন্তু পৃথিবীতে নারীরা কীভাবে পুরুষের হাতে বন্দি হলো ? এ বিষয়ে লেনিনকে ইতিহাসের জ্ঞান দান করে তার অধ্যাপক মামা। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত সম্পত্তি সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে সম্পদের উত্তরাধিকার নির্ণয়ে নিশ্চিত হতে পুরুষ বন্দি করে নারীকে। তারা নারীর ওপর চাপিয়ে দেয় সতীত্ব সম্পর্কে নানা মূল্যবোধ। ফলে নারী হয়ে ওঠে আরেকটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি মাত্র। এই পর্যায়ে চলচ্চিত্রকার অ্যানিমেশনচিত্র ব্যবহার করেন। এমনটি দেশীয় চলচ্চিত্রে প্রথম।

মজার বিষয় হলো, বাস্তব জীবনে লেনিন তার স্বপ্নলোকের রমণীকে পায়। তাদের মিলন হয়। রূপকথার মতোই ‘অতঃপর তাহারা সুখে বসবাস করিতে থাকে’। এ প্রসঙ্গে প্রথিতযশা চলচ্চিত্রকার, সমালোচক ও তাত্ত্বিক তানভীর মোকাম্মেল বলছেন :

অর্ফিউস হারিয়েছিল তার ইউরিডিসকে। পুরুষপুঙ্গব লেনিনও প্রতিশ্রুতিমতো ভোর চারটের আগে পৌঁছাতে পারে নি তার মানবীর কাছে।

তবে এক উজ্জ্বল জীবনবোধ ও কৌতুকবোধের পরিচয় দিয়ে পরিচালক লেনিনের সেই ক্ষতিপূরণের ব্যাপারটি ছবিতে রেখেছেন। বোন ক্লিওর বান্ধবী সুজলা—মিষ্টি স্নিগ্ধ বাঙালি মেয়ে, চিরকালের সেই পাশের বাড়ির মেয়েটির মাঝেই তো খুঁজে পেতে হবে স্বপ্নের মানবীকে। লেনিন তা পায়ও। শেষ দৃশ্যে যেভাবে সুজলার চোখের ক্লোজআপে পরিচালক ছবিটি শেষ করে তা একজন অতঁর পরিচালক হিসেবে তাঁর আত্মবিশ্বাসেরই পরিচায়ক, এই আত্মবিশ্বাস যে, এতক্ষণ যে কাহিনি তিনি শোনালেন তা একটা উপভোগ্য পরিণতিতে পৌঁছে। তাই শুধুমাত্র দুটি চোখের ক্লোজআপেই ছবির সমাপ্তি টানবার সাহস পান।

লেনিন-মানবীর এই রোমান্টিক বিমূর্ত প্রেমের সমান্তরালে চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির রাসেল-মনিকার জাগতিক প্রেমকে এমনভাবে উপস্থাপিত করেছেন যে নারী-পুরুষের সম্পর্ককে দুটি ভিন্ন দুটি প্রেক্ষিত থেকে বিচার করা যায়। যদিও ছবির এই উপকাহিনিটি—মনিকা-রাসেলের দৈহিক সম্পর্ক, মনিকার রাসেলের স্ত্রীর মর্যাদা লাভের আকাক্সক্ষা, রাসেলের দ্বিধা, মনিকার বিদেশ যাত্রার প্রস্তুতি, রাসেলের মন পরিবর্তন এবং তাদের মিলন পুরো ছবির থিমের সাথে মিলিয়ে দেখলে পুরুষতান্ত্রিকতার কাছে নারীর আত্মসমপর্ণের মতোই মনে হয়। এ পর্বটি নির্মাণে দুটো উদ্দেশ্য কার্যকর হতে পারে। প্রথমত, কবির এই পর্বটিকে মূল পর্বের একটি অ্যান্টি থিসিস হিসেবে উপস্থাপিত করতে চেয়েছেন এবং উভয়ের দ্বন্দ্বে একটি গুণগত ভাব নতুন চেতনায় দর্শককে আলোকিত করতে চেয়েছেন। সে ক্ষেত্রে তিনি ব্যর্থ এজন্য যে, মূল পর্বটি এই পর্বের ঠিক বিপ্রতীপ তত্ত্ব নয় এবং নির্মাণ প্রক্রিয়া কখনো এই দুই কাহিনির অন্তঃস্থ দ্বন্দ্বকে প্রতিভাত করতে সক্ষম হয় না। দ্বিতীয়ত, সোজাসুজি বাণিজ্যিক চাহিদার কাছে মাথা নত করেছেন তিনি। দুঃখজনক হলেও এটি একটি সম্ভাবনা বটে।

‘সূর্যকন্যা’র মৌল প্রতিপাদ্য ‘নারীমুক্তি’—এটি চলচ্চিত্রে একটি রূপকে প্রকাশিত। কিন্তু যথার্থতা প্রশ্নসাপেক্ষ। নিম্নমধ্যবিত্ত শিল্পী লেনিনকে যদি সংস্কারমুক্ত এবং মূল প্রবাহ থেকে ভিন্ন একজন পুরুষ হিসেবেও গ্রহণ করা যায়, তবু তার প্রায় নিষ্ক্রিয় তপস্যা (!) কী করে মূর্তির পাষাণমুক্তি ঘটায় তা বোধগম্য নয়। অর্থাৎ সচেতন পুরুষের উদ্যোগকে যদি কবির কামনা করেন তাতে আপত্তি নেই, কিন্তু নারীমুক্তি আন্দোলনে সেই পুরুষের ভূমিকা কিংবা নারীর নিজস্ব উদ্যোগের কোনো কিছুই নির্দেশিত হয় না ছবিতে। পুরো বিষয়টিকে শেষপর্যন্ত ‘প্রেমের জোর’-এর মতো যুক্তিহীন আবেগজাত ব্যাপার বলে মনে হয়। তবু বাংলাদেশের কাহিনিচিত্রে নারীমুক্তির মতো একটি জরুরি এবং ঐতিহাসিক মানবিক সমস্যা প্রতিভাত হওয়ার জন্য ‘সূর্যকন্যা’ তাৎপর্যপূর্ণ একটি চলচ্চিত্র।

‘সূর্যকন্যা’-য় ভাঙনমুখী মধ্যবিত্ত জীবনের কিছু বিষয়ও উঠে এসেছে। যেমন, “কলেজের চাকুরির কী হলো” বাবার এই প্রশ্নে বেকার থাকা লেনিন উত্তর দেয় : “মিনিস্টার-ফিনিস্টার না ধরলে চাকুরি আজকাল হয় না।” বিষয়টি ১৯৭৬ সালে যেমন সত্য ছিল, আজও তা মিথ্যে হয়ে যায় নি।

নাগরিক বর্ষার চিত্রও রয়েছে এই সিনেমায়। আমরা দেখি, লেনিন যেদিন চাকরি পায় সেদিন বৃষ্টি নামে।

চলচ্চিত্রটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন—বুলবুল আহমেদ, রাজশ্রী বসু, আহসান আলী, জয়শ্রী রায়, অজয় ব্যানার্জি, সুনিতা, মায়া হাজারিকা, আরিফুল হক, ফ্লোরা সরকার। চিত্রগ্রহণ : এম এ মোবিন। সম্পাদনা : দেবব্রত সেনগুপ্ত। সংগীত : সত্য সাহা। চলচ্চিত্রটির দুটি গান ‘চেনা চেনা লাগে তবু অচেনা’ এবং ‘আমি আঁধারে বন্দিনী’ চিরকালের আবেদনে সমৃদ্ধ।

Leave a Reply

Your identity will not be published.