রানওয়ে

রানওয়ে

রানওয়েতে ছুটে চলেছে স্ত্রীলংকান এয়ারলাইনসের ইউএল ১৮৯ এয়ারক্রাফট। সকল যাত্রী সিটবেল্ট বেঁধে নিয়েছে। আমার ঠিক উল্টোদিকে বসা বিমানবালা মাধুসেনার সাথে চোখাচোখি হলো। ভদ্রতার বিনম্র স্নিগ্ধ হাসি উপহার দিয়ে ডান হাতের পরশে কানের কাছে থুতনি বরাবর নেমে আসা চুলগুলো সরিয়ে নেয় সে সন্তর্পণে। একটু পরে তার হাত থেকেই আমরা দুপুরের খাবার পাব, এই স্বপ্নে বিভোর।
এই সময়টাতে এয়ারক্রাফটের গ্রাউন্ড স্পিড থাকে অনেক বেশি। হঠাৎ পাইলট কড়া ব্রেক মারলেন। এই ব্রেক মারা বিষয়টা আমরা বাস, ট্রাক, কার এমনকি ট্রেনে দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু আকাশযানে ব্রেক খাওয়ার এই অভিজ্ঞতা আমার প্রথম। এয়ারক্রাফটের মাথা আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড পরেই বাতাসে ভেসে উঠত। সব যাত্রীই যে যার ধর্ম মতে স্রষ্টাকে ডাকতে শুরু করেছে।
ক্র্যাশশশশশশ করে আওয়াজ হয়ে বিরাট ঝাঁকি খায় সবাই। একেবারে সিটবেল্ট ছিঁড়ে যাওয়ার অবস্থা। কোনোমতে ধাক্কা সামলে নিয়ে বাংলা মদ খাওয়া সোরেন হেমব্রম-এর মতো টলতে টলতে রানওয়ের শেষ প্রান্তে গিয়ে থামে এয়ারক্রাফট। সবাই এবার জোরে দম নেয়। মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্ত কেমন তা যেন সবাই টের পেয়ে যায় এবার। নতুন জীবনের জন্য স্রষ্টার কাছে সবাই কৃতজ্ঞতা জানায়। পাইলটের কন্ঠ ভেসে আসে এবার : “যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আমরা এই মুহূর্তে উড্ডয়ন করতে পারছি না। ইঞ্জিনিয়ার এসে রিপোর্ট করার পরেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে।”
আমরা পড়েছি মহা ঝামেলায়। মনে মনে বলি, ইঞ্জিনিয়ার জোড়াতালি দিয়ে ঠিক করে দিলেও এই এয়ারক্রাফটে চড়ে যাওয়া ঠিক হবে তো!
সবশেষে দুই ঘণ্টা পরে আমাদের জানানো হলো, আমাদের নতুন এয়ারক্রাফটে করে ঢাকা নিয়ে যাওয়া হবে। যাক, এবার অন্তত মনের সংশয় দূর হলো। হুড়োহুড়ি করে সবাই নেমে আবারও এয়ারপোর্টে চেক ইন রুমে প্রবেশ করি। প্রায় একটার দিকে আমাদের নতুন বিমানে তোলা হয়।
আমি পড়েছি তিন সিটের বাঁয়ের সিটে। আমার ডানে আমার ট্রাভেল পার্টনার বন্ধু নোবেল আর তার ডান দিকে আরেক বন্ধু মবিন।
হোটেল থেকে বের হওয়ার সময় সবাই আমরা ব্রেকফাস্ট সেরে নিলেও মবিনের ইচ্ছা যে সে এয়ারলাইনসে দেওয়া নাশতাই খাবে। এখন সময় প্রায় বেলা একটা। মবিনের অবস্থা খুবই খারাপ। শুনেছি সে টাইপ টু ডায়াবেটিস পেসেন্ট। তাকে খেতেই হবে। কিন্তু কোনো উপায় নেই।
অবশেষে দুপুর দেড়টার সময় আমাদের নতুন এয়ারক্রাফটে করে ঢাকা যাত্রা শুরু হলো। আমার সামনের যাত্রীর নাম কায়সার রহমান। পাকিস্তানি নাগরিক। প্রায় পঞ্চান্ন বছর পর তিনি বাংলাদেশ বেড়াতে আসছেন। যুদ্ধের সময় তার পিতা পূর্ব পাকিস্তানের বগুড়ায় কোনো সরকারি অফিসের অধিকর্তা ছিলেন। সেই সুবাদে তিনি বগুড়া করোনেশন স্কুলে ক্লাস এইটে পড়তেন। এত বছর পরে তিনি সেই স্কুল দেখতে আর হারানো বন্ধুদের সাথে আনন্দে সময় কাটাতে যাচ্ছেন। নতুন জীবন পেয়েছেন আজ তিনিও। নতুন এয়ারক্রাফটে চড়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আল্লাহ জো কারতা হ্যায়, বেহতার হি কারতা হ্যায়” (আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।)
আমি টেনশনে বলতেই ভুলে গিয়েছি, আমার ডান পাশে বসা বন্ধু নোবেল একজন প্রসিদ্ধ সিগারেটখোর। পারলে আগের শেষ করা সিগারেটের শেষ প্রান্তে লাগানো তুলার আগুনে পরের সিগারেট ধরিয়ে নেয় সে। শ্রীলঙ্কা ভ্রমণে আমি তার সিগারেট খাওয়া দেখেছি কাছ থেকে। সে যতগুলো সিগারেট খেয়েছে, আমার মনে হলো আমি আমার সারাজীবনে এতগুলো কাঁচামরিচই দেখি নি। আজ সে সকালে গোসল করার সময় পায় নি। কাজেই তার শরীর আর মুখের গন্ধে আমার বমি আসার জোগাড়। পুরো এয়ারক্রাফটের মধ্যে নিকোটিন ছড়িয়ে গিয়েছে নোবেল। সবাই অনুভব করছেন, কিন্তু কিছু বলার জো নাই। তার গায়ে সিগারেটের গন্ধ এমনভাবে মিশে গেছে যে মনে হয় সে মানুষ নয়, হাঁটতে-চলতে থাকা একটি তামাক কারখানা। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, যদি বিমানের কোনো ইঞ্জিন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তার শার্ট চিপে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
আমি আর সহ্য করতে না পেরে মবিনকে বলি, মবিন, তোর সাথে জরুরি কথা আছে। তুই আমার পাশের সিটে চলে আয়। আর নোবেলকে তোর সিটে দে।
মবিন আমার পাশের সিটে বসলে আমি নির্ভার হই।
কায়সার রহমানের কথা মনে হলো, আল্লাহ জো কারতা...। কিন্তু আমি জানতাম না যে আমি কী ভুল করেছি। শুনেছি মানুষ খাল কেটে কুমির আনে। আর আমি এনেছি আস্ত শুয়োর!
মনে মনে জল্পনা করছি যে বাসায় ফিরে আর্জেন্টাইন ভক্ত বউয়ের সাথে কীভাবে সকার যুদ্ধ করব। আমার দু’চোখে হলুদ জার্সির হুল্লোড়।
বন্ধু মবিন কানের কাছে মুখ এনে বলে, এবার বল, কী যেন বলতে চাচ্ছিস!
মাগো, ও মা! তার মুখের সমস্ত দুর্গন্ধ আমার নাকে আঘাত করে। এই বেলা দেড়টা অবধি তার পেটে কিছুই পড়ে নি। ডায়াবেটিস পেসেন্টের এই মুখের গন্ধে আমি জ্ঞান হারানোর অবস্থায়। মুখ খুললেই মনে হয় বহুদিন ধরে অবরুদ্ধ কোনো প্রাচীন গুহার দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। সেই গুহার ভেতরে হয়তো ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব আর জীবাশ্মের অমূল্য সম্পদ লুকিয়ে আছে; কিন্তু গন্ধটা যে মানবসভ্যতার জন্য কতটা হুমকি, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমার মনে হলো, বিধাতা তার পাকস্থলী ঠিক গলা থেকেই শুরু করেছে। উঁকি দিলেই তার আলজিব-এর পরেই অর্ধ চিবানো খাবার দেখা যাবে। আমার আর্জেন্টাইন ভক্ত বউ তর্কে জেতার জন্য আমাকে প্রায়ই বলে “পরেছো তো ‘গু’ কালারের জার্সি! তোমাদের খেলায় কী আর না খেলায় কী!” সেই টিপ্পনি সহ্য করেছি।
আমি চ¶ু হাসপাতালের ‘গু’ কালারের দেয়ালও দেখেছি। সেটাও চোখে সহনীয় ছিল। কিন্তু আজ জীবনের প্রথম ‘গু’ কালারের দুর্গন্ধ শুঁকেছি। এটা আর নিতে পারলাম না। অবস্থাটা অনেকটা দুই রাজ্যের যুদ্ধে আটকে পড়া নিরীহ কৃষকের মতো। একদিকে মবিনের মুখবায়ু, অন্যদিকে নোবেলের ধোঁয়াবাহিত সুবাস। আমার নাক তখন জাতিসংঘের মতো শান্তিচুক্তি করানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। একসময় আমার পাকস্থলী বিদ্রোহ ঘোষণা করল। পৃথিবীর সব আন্দোলনের যেমন একটি চূড়ান্ত মুহূর্ত থাকে, আমার পাকস্থলীরও ছিল। আর সেই বিপ্লবের লাভা গিয়ে উদ্গিরিত হলো পাশের সিটে বসা ভদ্রলোকের গায়ে। ভদ্রলোক পাকিস্তানি। তার নাম আগেই বলেছি। কায়সার রহমান।
আমি তো লজ্জায় এমন অবস্থায় পড়লাম যে, ইচ্ছে করছিল সঙ্গে সঙ্গে বিমানের জরুরি দরজা খুলে প্যারাস্যুট ছাড়া লাফ দিই।
কিন্তু কায়সার রহমান আশ্চর্য শান্ত। তিনি ধীরে ধীরে রুমাল বের করলেন। জামা মুছলেন। তারপর এমন প্রশান্ত হাসি দিলেন, যেন আমি তার গায়ে বমি নয়, আতর ছিটিয়েছি। তারপর বললেন, আল্লা জো...
প্লেনের মধ্যেই আমি তার বগুড়ার করোনেশন স্কুলের বিভোর স্বপ্নকে সাতমাথায় এনে ফেলেছি। এখণ সে কোন রাস্তায় যাবে তা মাথায় আসছে না।
আল্লাহ জো...
আমি হতবাক।
বললাম, “জনাব, আমি আপনার গায়ে বমি করলাম, আর আপনি বলছেন—আল্লাহ যা করেন ভালোই করেন ?”
তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে দার্শনিক ভঙ্গিতে বললেন, “ভাই, আমি যাচ্ছি বগুড়া করোনেশন স্কুল দেখতে। ক্লাস এইটে যে বেঞ্চে বসতাম, সেখানে গিয়ে কিছু¶ণ বসব। পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেব। বয়স বাড়ছে, মানুষ নস্টালজিক হয়।”
আমি বললাম, “তা বমির সঙ্গে এর সম্পর্ক কী ?”
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এই শার্টটা আমার স্ত্রী পাঁচ বছর আগে ফেলে দিতে বলেছিল। আমি ছাড়ি নি। আজ আপনার কল্যাণে বুঝলাম, শার্টটার বিদায়ের সময় হয়েছে।”
আমি চুপ।
তিনি আবার বললেন, “আরেকটা লাভ হয়েছে।”
“কী লাভ ?”
“আপনার বন্ধু মবিন আর নোবেলের মাঝখানে বসে থাকলে হয়তো পুরো যাত্রায় ধীরে ধীরে কষ্ট পেতাম। এখন অন্তত একবারে সব হয়ে গেছে!”
আমি তাকিয়ে দেখি, মবিন মুখ বন্ধ করে বসে আছে, যেন রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে গেছে। আর নোবেল এমনভাবে সিটের নিচে তাকিয়ে আছে, যেন হারানো বিবেক খুঁজছে।
কায়সার রহমান এবার কাব্যিক ভঙ্গিতে বললেন, “জীবনটা নদীর মতো। কখনো ফুল ভাসে, কখনো কলাগাছ, কখনো আবার আপনার মতো যাত্রী ভাসিয়ে দেয় পাকস্থলীর সম্পূর্ণ ইতিহাস।”
তারপর আবার সেই বিখ্যাত উক্তি—“আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।”
ঢাকায় নামার পর তিনি বিদায় নিতে নিতে বললেন, “আজ আমি দুইটা শি¶া পেলাম। প্রথমত, পুরোনো শার্টেরও মৃত্যু আছে। দ্বিতীয়ত, বিমানে কখনো মবিন আর নোবেলের মাঝখানে বসা যাবে না।”
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি দিলাম।
আর মনে মনে ভাবলাম, পৃথিবীতে আশাবাদী মানুষ অনেক দেখেছি, কিন্তু যার গায়ে বমি পড়ে আর সে তবুও হাসিমুখে বলে—“আল্লাহ জো...”
সে নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষ নয়; সে মানবজাতির ধৈর্য বিভাগের শেষ জীবিত প্রতিনিধি!
 

Leave a Reply

Your identity will not be published.