সেরাজ

সেরাজ

এলাকায় বসেছিলাম। এলাকার কয়েকজন ছোট ভাই আড্ডা দিচ্ছিল—কেউ কেউ গল্পগুজব করছে।
ঠিক তখনই একটা ছেলে এল।
ছোটখাটো, রোগা, পাতলা শরীর। চোখে ক্লান্তির গভীরতা, যেন অনেকদিনের অনাহার তার শরীরের ভেতরে স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছে। এসে সালাম দিল।
আমি তাকিয়ে একটু চমকালাম। না, মুখটা মোটেও পরিচিত না।
বললাম, ভালো আছো ? চিনতে পারলাম না তো তোমাকে।
ছেলেটা মাথা নিচু করে বলল, আমি সেরাজ, ভাই। আপনার ফেসবুক আইডিতে আছি।
ফেসবুক—শব্দটা যেন হঠাৎ করে আমাদের এই বাস্তব আড্ডার ভেতরে ঢুকে পড়ল।
আচ্ছা, সেরাজ। বলো, কী খবর ?
ভাই বাড়ি থেকে রাগ করে বের হয়েছি। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। একটা কাজ যদি জোগাড় করে দিতেন।
তার কণ্ঠে কোনো নাটক ছিল না। ছিল শুধু হালকা কাঁপুনি, আর বেঁচে থাকার সরল তাগিদ।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। কয়েকদিন আগেই একটা কনস্ট্রাকশনের কাজ পেয়েছি। সাইট শুরু হলেই লোক দরকার হবে।
বললাম, পড়াশোনা কতদূর ?
ইন্টারমিডিয়েট।
একটু ভেবে আবার বললাম, আচ্ছা, একটা সাইট শুরু করব। তুমি সেখানে দেখাশোনা করবে। খুব কঠিন কাজ না। শুধু খেয়াল রাখবে সব ঠিকমতো চলছে কি না।
পাশ থেকে কেউ বলল, ভাই, ওকে তো ঠিকমতো চিনেন না।
হেসে বললাম, সৎ হলে অনেক কিছু শেখানো যায়।
সেরাজ মাথা তুলে বলল, ভাই, আমি সৎ থাকব। শুধু দোয়া করবেন।
সেদিন সে চলে গেল।
সেরাজের সঙ্গে আমার পরিচয়ের শুরুটা এভাবেই।

প্রথমদিকে সব ঠিক ছিল। সাইট থেকে মাঝে মাঝে খবর দিত, কাজ চলছে, সমস্যা নেই। কিন্তু কিছুদিন পরেই বদল আসতে শুরু করল।
একদিন ভাটার লোক এসে বলল, এক ট্রাক ইটের হিসাব মিলছে না। তারা বলল, সেরাজের সামনেই ডেলিভারি হয়েছে।
কিন্তু সেরাজ বলল, সে জানে না।
আমি আর হিসাব মেলালাম না।
কোনোদিন কিছু বলিও নি।
মনে হয়েছিল, বয়স কম, দায়িত্ব নতুন, সময় দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
অথচ সেরাজ বলে সে ইট বুঝে পায় নি। 
যদিও সেরাজের কথা আমি বিশ্বাস করি নি, তবুও তাকে কিছুই বুঝতে দিই নি।
ভাটার ইটের টাকাও শেষমেষ পরিশোধ করেছি। 
দুই-এক সপ্তাহ পর পর দুই/তিন বস্তা করে সিমেন্টের  হিসাব পাওয়া যায় না। রডের হিসাবেও বেশ গড়মিল। 
তবুও সেরাজকে এগুলোর কিছুই বলি নি। কারণ ভেবেছি গরিব ঘরের ছেলে, এই বয়সে হঠাৎ করে টাকার দেখা পেয়েছে। একটু বয়স হলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। 
কিছুদিন পর আরেকটি গরিব ছেলেকে সেরাজের সাথে কাজ শেখার জন্যে রাখলাম আমি। 
তখন একটা অদ্ভুত বিষয় খেয়াল করলাম।
দিন দিন সেরাজের কাজের প্রতি আগ্রহ কমে গেল। 
নতুন ছেলেটার কাছে শুনলাম, সে প্রতিরাতে সেন্ট্রাল এক সাবেক সভাপতি গোলাম মহির সাথে নিয়মিত অনলাইন মিটিং করে। 
কিছুদিন পর সেই প্রমাণও পেলাম। 
সে নিজেই একদিন আমাকে বলল, মহি ভাইকে আপনার কথা বলেছি। চেনেন তো তার বিশাল পরিচিতি। 
তাই নাকি, ভালো খবর। কিন্তু সেরাজ ভাই শোন, এখন তোমার পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়া উচিত। এগুলো করার জন্য সামনে আরও অনেক সময় পাবে তুমি। কিন্তু সময় শুধু চুপ করে থাকে না—সে বদলও লিখে রাখে।
এরপর সেরাজের মধ্যে আরেকটা পরিবর্তন এল।
সে হঠাৎ করে একজন ‘সংগঠক’ হয়ে উঠল। সাইটের কাজের চেয়ে তার ফোনের স্ক্রিন বেশি ব্যস্ত থাকত।
তারপর একদিন বলল, আমাকে যেতে হবে ভাই। বাসার সমস্যা, পরীক্ষা।
সে চলে গেল।

তারপরই শুরু হলো আসল গল্পের ভাঙন।
দোকানদারদের কাছে তার দেনা, রডের হিসাব, সিমেন্টের বস্তা—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত দায়ের জাল খুলতে লাগল। আমি একে একে সব মিটিয়ে দিলাম।
ভাবলাম, মানুষ তো শেখে।
মানুষই তো বদলায়।
কিন্তু মানুষ কখনো কখনো শুধু জায়গা বদলায়—স্বভাব না।
কিছুদিন পর ফেসবুকে তার একটা পোস্ট দেখলাম।
আমি নাকি খারাপ মানুষ। ছদ্মবেশী। প্রতারণা করেছি।
চারদিকে আলোচনা।
মানুষ আমাকে প্রশ্ন করছে, এটা কীভাবে সম্ভব ?
আমি কোনো উত্তর দিই নি।
কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না—শুধু সহ্য করতে হয়।
সময় আবার কেটে গেল।
সেরাজ ফোন করল। ঢাকায় আছে। ফুড ডেলিভারি করে। টাকা লাগবে। দিলাম।
আবার লাগবে। আবার দিলাম।
তারপর একদিন মেসেজ এল—আরও কিছু দরকার।
সঙ্গে কিছু নীতিকথাও। আমি ভাবলাম, হয়তো মানুষটা বদলাচ্ছে। 
এর দুইদিন পর সকালে তপু ভাই মেসেজে আমাকে একটা স্ক্রিনশট পাঠাল।
সেরাজ নামে একজন তোমাকে নিয়ে একটা পোস্ট করেছে, দেখে মনটা খুব খারাপ হয়েছে ভাই, তাই ভাবলাম তোমাকে বিস্তারিত জানাই। 
পোস্টের মূল বক্তব্য, সেরাজ আমাকে খুব ভালোভাবে চেনে, আমি ছদ্মবেশী! 
অসংখ্য মানুষ ক্রমাগত ফোন আর মেসেজ করছে। 
তাদের সবার একটাই কথা, এটা কীভাবে সম্ভব! তবুও আপনি তাকে কিছু বলছেন না ভাই ? 
কারও প্রশ্নের জবাব দিতে পারি না। 
নিশ্চুপ বসে বসে সেরাজের করা পোস্টটার দিকে একমনে কেবল তাকিয়ে থাকি।
ভাবি কথায় আছে, কেউ যদি তোমার ক্ষতি করে, বুঝতে হবে কখনো তুমি তার নিশ্চয়ই উপকার করেছিলে।
তারপর একদিন সকালে খবরের কাগজ খুলে দেখি—একটা ছোট্ট খবর।
‘রেললাইনের পাশে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার।’
নামটা চোখে পড়তেই বুকের ভেতরটা অচেনা ভারে নুয়ে গেল।
সেরাজ। ছবিটা স্পষ্ট ছিল না। শুধু একটা জীবন পড়ে ছিল খবরের এক কোণে—অবহেলায়, অসম্পূর্ণভাবে।
আমি অনেকক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকলাম। বাইরে তখনো হয়তো আড্ডা চলছিল। কেউ হাসছিল। কেউ বাঁচার গল্প বলছিল।
আর আমার ভেতরে শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—মানুষ কি সত্যিই কাউকে চেনে ?
নাকি শুধু নিজের দয়ার গল্পটাই বিশ্বাস করে ?
 

Leave a Reply

Your identity will not be published.